পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন মনে করা এবং সার্বজনীন উৎসব হিসেবে দেখা হলেও, এর সূচনালগ্ন এবং বিবর্তনের ইতিহাস মূলত একটি রাজনীতির প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উদ্ভব।
সনের প্রবর্তন: হিজরি সন ও কৃষি অর্থনীতির রাজস্ব আদায়।
ইতিহাসবিদদের মতে সম্রাট আকবরের সময় পর্যন্ত ভারতে প্রচলিত ছিল হিজরি সন। হিজরি সন একটি চান্দ্রবর্ষ (৩৫৪/৩৫৫ দিন), যা প্রতি বছর ১০-১১ দিন করে এগিয়ে আসে। ফলে সৌরবর্ষের (৩৬৫ দিন) ঋতুচক্রের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য থাকে না।
ফসল উৎপাদন এবং কৃষকদের চাষাবাদ চন্দ্রবর্ষের সাথে হতো। যেমন ফসলের বীজের অঙ্কুর হওয়া, ফসল উৎপাদনের সময়সীমা এগুলো হিজরি সন অনুযায়ী করা হতো।
তৎকালীন সময়ে রাজস্ব বা খাজনা আদায় করা হতো ফসলি মৌসুমের ওপর ভিত্তি করে। কারণ নগদ মুদ্রা বা অর্থের চেয়ে কৃষকদের উৎপাদিত কৃষি ফসল দিয়ে খাজনা পরিশোধ করা কৃষকের জন্য সনজলভ্য ছিলো।
বছরে হিজরি সনের অগ্রগতির কারণে দেখা যেত, কৃষকের ঘরে ফসল আসার আগেই খাজনা আদায়ের সময় উপস্থিত হতো। ফলে খাজনা আদায় এবং কৃষকদের খাজনা প্রদান কষ্টসাধ্য ছিলো।
এই অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে সম্রাট আকবর তাঁর রাজজ্যোতিষী ফতেহউল্লাহ সিরাজিকে একটি নতুন ক্যালেন্ডার তৈরির নির্দেশ দেন। যা ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে 'ফসলি সন' নামে পরিচিতি পায়।
পহেলা বৈশাখ: উৎসব নয়, বরং 'রাজস্ব দিবস'
শুরুতে পহেলা বৈশাখ কোনো আনন্দ উৎসবের দিন ছিল না। এটি ছিল মুঘল আমলের একটি প্রশাসনিক তারিখ।
পুণ্যাহ: এই দিনে প্রজারা জমিদারের কাছ থেকে নতুন বছরের জন্য বন্দোবস্ত নিতেন এবং বকেয়া খাজনা পরিশোধ করতেন।
হালখাতা: এটি মূলত ব্যবসায়ীদের একটি অর্থনৈতিক সংস্কৃতি। পূর্ববর্তী বছরের দেনা-পাওনা চুকিয়ে নতুন খাতা খোলার মাধ্যমে বাণিজ্যিক হিসাব শুরু করা হতো।
অর্থাৎ, পহেলা বৈশাখের আদি রূপটি ছিল সম্পূর্ণ লেনদেন-কেন্দ্রিক। এটি মূলত শাসক ও শোষিত—উভয় পক্ষের জন্যই একটি বার্ষিক হিসাব-নিকাশের দিন হিসেবে কাজ করত।
পান্তা-ইলিশ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা: এটা কোন বাঙালী সংস্কৃতি নয়, নতুন সংযোজন
ঐতিহাসিকভাবে পান্তা ভাতের সাথে ইলিশ মাছের কোনো প্রাচীন যোগসূত্র পাওয়া যায় না। পান্তা মূলত কৃষকের সাধারণ সকালের নাস্তা ছিলো। ভোর হতেই কৃষকেরা কাজের জন্য মাঠে ছুটে, কাজ করতে হবে,পরিশ্রম করতে হবে তা-ই সকালের নাস্তা হিসেবে পান্তাই ছিলো মূল খাবার। কিন্তু এর সাথে ইলিশের কোন যোগসূত্র ছিলোনা। ইলিশতো দুঃসাধ্য এক দামী মাছ যা বিলে-ঝিলে সবখানে হয়না।
পান্তা-ইলিশের প্রবর্তন: ১৯৮৩ সালে রমনা বটমূলে একদল তরুণের শখের বশে পান্তা ও ইলিশ খাওয়ার মাধ্যমে এটি জনপ্রিয় হয়। এটি মূলত আশির দশকের একটি শহুরে 'ফ্যাশন' যা পরে ব্যবসায়িক প্রচারণায় ঐতিহ্যের রূপ ধারণ করে। এখন এই ইলিশ নিয়ে চড়ামূল্যের ব্যবসা হয়। যা পহেলা বৈশাখের দিনেও
খাবার প্লেটে ওঠেনা। এটা আবার বাঙালী সংস্কৃতির অংশ হয় কিভাবে?
সাংস্কৃতিক রূপান্তর: একইভাবে মঙ্গল শোভাযাত্রা বা পহেলা বৈশাখে বিভিন্ন পশুপাখির প্রতিকৃতি ব্যবহার আশির দশকের শেষের দিকের (১৯৮৯) একটি সংযোজন। এটি কোন প্রাচীন ঐতিহ্য নয় যা সমকালীন চারুকলার একটি ভঙ্গুর সৃজনশীল কিছু আকৃতি
ক্যালেন্ডার দ্বিমত
বাংলা সন গণনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে পার্থক্য। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন কমিটির সংস্কার অনুযায়ী বাংলাদেশে এখন একটি নির্দিষ্ট তারিখে (১৪ এপ্রিল) বৈশাখ পালিত হয়। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে প্রাচীন পঞ্জিকা অনুসরণ করায় সেখানে প্রতি বছর তারিখ পরিবর্তিত হতে থাকে। অর্থাৎ বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ পালিত হয় একসময়ে পশ্চিবঙ্গে হয় অন্য সময়ে "সনাতন ও আধুনিক গণনার দ্বন্দ্বে গোঁজামিল।
বিবর্তিত ইতিহাস।
তারিখ-ই-ইলাহী' এবং বর্তমান 'বঙ্গাব্দ' বা বাংলা সনের বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো। ইতিহাস, ভাষা এবং সংস্কৃতির মিশ্রণকে যদি আমরা অনুসন্ধান করি তাহলে এর আসল চিত্র খুঁজে পাওয়া যায়।
তারিখ-ই-ইলাহী এবং পারস্য প্রভাব
বঙ্গাব্দ বা তারিখে-ই-লাহী ঐতিহাসিক ভিত্তি বেশ শক্তিশালী। সম্রাট আকবর ১৫৮৪ সালে যে নতুন ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন, তার নাম ছিল 'তারিখ-ই-ইলাহী'। এখানে এলাহী বলতে বাদশাহ আকবর।
আকবর নিজেই একটা ধর্ম বানিয়েছিলো,
যার নাম ছিলো- দ্বীন-ই-এলাহী।
এটি মূলত পারস্যের (ইরানি) সৌর ক্যালেন্ডারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। যার নাম দেওয়া হয় তারিখে ই-ইলাহী।
মাসের নাম: আকবর যে ১২টি মাসের নাম ব্যবহার করেছিলেন সেগুলো ফরাসী শব্দ থেকে। কারণ আকবর নিজেও ফারসী ভাষী ছিলেন। মাসগুলোর নাম যেমন- ফারভারদিন, আরদিবেহেশ্ত, খোরদাদ, তির, আমর্দাদ/মুর্দাদ, শাহরিভার, মেহর, আবান, আজর, দে, বাহমান, এসফান্দারমুজ/এসফান্দ।
যেগুলো সরাসরি প্রাচীন পারস্য ক্যালেন্ডার থেকে নেওয়া। এটি ইসলামি বা হিজরি সনের (চান্দ্রবর্ষ) অনুসারী ছিল না।
হিন্দু প্রীতি ও তারিখে ই-ইলাহী।
মাসের নামের পরিবর্তন।
বাদশাহ আকবরের হিন্দু প্রীতি ছিলো অত্যধিক।
তার বেশ কয়েকজন স্ত্রী ছিলো হিন্দু ধর্মাবলম্বী।
এর মধ্যে জোধা বাই, কল্যাণ কুমারী, ভগবতী বাই, মনমতি বাই উল্লেখযোগ্য।
তাই হিন্দুদের অনেক অনুরোধ সে ফেলতে পারতো না।
অতঃপর সেই মাসের ফারসী নাম থেকে পরিবর্তন করে দেওয়া হয়। বৈশাখ, জৈষ্ঠ,আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ,মাঘ,ফাল্গুন,ইত্যাদি।
সুতরাং কেউ যদি বলে- তারিখ ই ইলাহী বাঙালীর ঐতিহ্য বা সৃষ্টি,তাহলে সে ঐতিহাসিক ভুল করবে।
কারণ এই সন সৃষ্টি দিল্লী-উত্তর প্রদেশের বাদশাহ আকবরের দ্বারা, যে ছিলো ফারসি ভাষী।
আবার কেউ যদি বলে- এটা মুসলিম সংস্কৃতি,
তবুও সে ঐতিহাসিক ভুল করবে।
বাস্তবে, এটা পারস্য ও ভারতের পৌত্তলিক সংস্কৃতির মিশ্রণ।
কোনো সংস্কৃতিই স্থবির নয়। সমাজের পরিবর্তন ঘটে, সংস্কৃতিরও পরিবর্তন ঘটে। সাড়ে চারশ বছর আগে যে কর আদায়ের 'প্রশাসনিক পরোয়ানা' শুরু হয়েছিল, তা সময়ের বিবর্তনে এবং রাজনৈতিক প্রয়োজনের তাগিদে তা আজ বাঙালী ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি হয় কিভাবে?
এই আধুনিক পহেলা বৈশাখ বাঙলার হাজার বছরের সংস্কৃতি নয় অনেক অনুষঙ্গই গত ৩-৪ দশকের উদ্ভাবন, যা প্রাচীন বাংলার লোকজ সংস্কৃতির সাথে কোনকিছুরই সরাসরি যুক্ত নয়।
সারকথা: বঙ্গাব্দ মূলত কৃষি ও অর্থনীতির মেলবন্ধন ঘটাতে সৃষ্ট একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা। এর উৎস কোনো ধর্মীয় বা জাতীয় সাংস্কৃতিক জাগরণ নয়, বরং কর আদায়ের সুবিধার্থে একটি ক্যালেন্ডার সংস্কার মাত্র।

0 মন্তব্যসমূহ