একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড নির্ভর করে তার জাতীয় সম্পদ এবং দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণের ওপর। তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বাণিজ্যিক চুক্তির তথ্য সামনে এসেছে, তা দেশের সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়েছে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে এই ধরনের ‘অসম চুক্তি’ অনেক বিশ্লেষকের মতে দেশের সম্পদ ও নিয়ন্ত্রণকে বিদেশের হাতে তুলে দেওয়ার এক বিপজ্জনক প্রক্রিয়া।
অসম চুক্তি: শর্তের বেড়াজালে দেশ
সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের বিনিয়োগ খাতকে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে এমনভাবে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। চুক্তির প্রধান শর্ত হিসেবে বাংলাদেশকে প্রাথমিকভাবে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে হবে। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এমন বিশাল অংকের ব্যয়বহুল ক্রয় কোনো বাণিজ্যিক প্রয়োজনীয়তা নাকি রাজনৈতিক চাপের ফল, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
খনিজ সম্পদ ও সরাসরি বিনিয়োগ। যা একটি দেশের মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলা।
এই চুক্তির সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হলো খনিজ সম্পদের ওপর বিদেশি নিয়ন্ত্রণ। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সরাসরি বিনিয়োগের সুযোগ এমনভাবে রাখা হয়েছে যে, তারা বাংলাদেশের:
- খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও খনন
- উত্তোলন ও পরিশোধন
- পরিবহন, বিতরণ ও রপ্তানি
এই প্রতিটি স্তরে সরাসরি অংশ নিতে পারবে। অর্থাৎ, দেশের মাটির নিচের অমূল্য সম্পদ আহরণ থেকে শুরু করে মুনাফা অর্জন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি একটি বিদেশি রাষ্ট্রের প্রভাবে চলে যাওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছে।
ভর্তুকি প্রত্যাহার ও শিল্পে আঘাত
চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার তার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো ধরনের ‘অবাণিজ্যিক সহায়তা’ বা ভর্তুকি দিতে পারবে না। এমনকি দেশের ভেতরের ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে সরকার কী ধরনের প্রণোদনা দিচ্ছে, তার সব তথ্য যুক্তরাষ্ট্রকে জানাতে হবে। বাজার প্রতিযোগিতার দোহাই দিয়ে এই ভর্তুকি বন্ধের বাধ্যবাধকতা দেশীয় শিল্পকে অসম প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দেবে। সরকারি সহায়তা ছাড়া দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো বিশ্ববাজারের দানবীয় কোম্পানিগুলোর সামনে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
নজরদারি ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় বাধ্যবাধকতা। যা একটি দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন রুখে দেওয়া।
চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (WTO) সব ধরনের ভর্তুকির তথ্য জমা দেওয়ার শর্ত রয়েছে। এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর এক ধরণের সরাসরি বৈদেশিক নজরদারি। যেখানে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে আসে, সেখানে একে ‘নজরদারি বৃদ্ধি’ হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে।
উপসংহার
বিনিয়োগের নামে দেশের খনিজ সম্পদ এবং শিল্প খাতের নিয়ন্ত্রণ বিদেশি শক্তির হাতে তুলে দেওয়া যে কোনো বিচারে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। ড. ইউনূসের সময়ে গৃহীত এই সিদ্ধান্তগুলো যদি দেশের সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান এবং দেশীয় সম্পদের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে একে ‘দেশ বিক্রির’ একটি আইনি দলিল হিসেবেই আগামী প্রজন্ম দেখবে। একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার বদলে পরনির্ভরশীল অর্থনীতির এই পথ হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
তথ্যসূত্র: কালের কণ্ঠ (১৮ এপ্রিল ২০২৬) এর প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে লেখা।

0 মন্তব্যসমূহ