ভূমিকা:
ইসলামী শরিয়তে কোরবানি কেবল একটি ধর্মীয় বিধান বা নিছক পশু জবাইয়ের নাম নয়; বরং এটি মহান আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য এবং ত্যাগের এক অনন্য মহিমা। জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট দিনগুলোতে সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের জন্য কোরবানি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আদি পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক ত্যাগের স্মৃতি বহনকারী এই বিধানের মূল লক্ষ্য হলো পশুর রক্ত বা গোশত নয়, বরং বান্দার অন্তরের তাকওয়া ও খোদাভীতি অর্জন করা। আজকের প্রবন্ধে আমরা কোরবানির প্রকৃত অর্থ, এর বিধান এবং এর পেছনের আধ্যাত্মিক শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করব। ইনশাআল্লাহ
শাব্দিক অর্থ: 'উযহিয়্যাহ' (الأضحية) শব্দটি 'দুহা' (الضحى) থেকে এসেছে, যার অর্থ পূর্বাহ্ণ বা দুপুরের আগের সময়। যেহেতু সাধারণত এই সময়ে কুরবানি করা হয়, তাই এর নামকরণ হয়েছে আযহা।
কুরবানি করার কারণেই এই ঈদকে 'ঈদুল আযহা' বলা হয়।
সূত্র: 'তাফসীরে ইবনে কাসীর', 'লিসানুল আরব' এবং 'মুগনি আল-মুহতাজ'
কুরবানির পারিভাষিক সংজ্ঞা (শরীয়তের দৃষ্টিতে)
ফকীহ বা ইসলামি আইনবিদদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে কুরবানির একটি সংজ্ঞা
ما يُذبح من بهيمة الأنعام يوم العيد وأيام التشريق تقرباً إلى الله تعالى.
"আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে ঈদের দিন এবং আইয়ামে তাশরীকের দিনগুলোতে (ঈদুল আযহার পরবর্তী তিন দিন) যে চতুষ্পদ জন্তু যবাই করা হয়, তাকেই কুরবানি বলা হয়।"
কোরবানীর হুকুম ও বিধান।
প্রথমত(ইমাম আবু হানিফা ও অন্যান্য): কোরবানী করা 'ওয়াজিব' বা আবশ্যক।
তারা সূরা কাউসারে নির্দেশ
পবিত্র কুরআনের আয়াত
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
"অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামায পড়ুন এবং কোরবানী করুন।" (সূরা আল-কাউসার, আয়াত:০২)
এবং হাদীসে বর্ণিত কঠোর সতর্কবার্তাকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করেন।
হাদীস----
مَنْ وَجَدَ سَعَةً لأَنْ يُضَحِّيَ فَلَمْ يُضَحِّ فَلاَ يَقْرَبَنَّ مُصَلاَّنَا
"সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কোরবানী করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।" (সুনানে ইবনে মাজাহ/মুসনাদে আহমাদ)
দ্বিতীয়ত (জুমহুর বা অধিকাংশ ওলামায়ে কেরাম): কোরবানী করা 'সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ'।
হাদীস শরীফ
إِذَا دَخَلَتِ الْعَشْرُ وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ فَلاَ يَمَسَّ مِنْ شَعَرِهِ شَيْئًا
"যখন (জিলহজ মাসের) দশ দিন শুরু হয় এবং তোমাদের কেউ কোরবানী করার ইচ্ছা পোষণ করে, তবে সে যেন তার চুল (এবং নখ) স্পর্শ না করে (অর্থাৎ না কাটে)।" (সহীহ মুসলিম)
তারা উক্ত হাদীসে প্রমাণ হিসেবে পেশ করেন, যেখানে (وأراد)"ইচ্ছা পোষণ করা" শব্দটির মাধ্যমে এটি ওয়াজিব নয় বলে বোঝানো হয়েছে। তাই কোরবানি করা ওয়াজিব নয় সুন্নাত।
কোরবানী ওয়াজিব কখন হয়।
প্রথম অবস্থা: মানত করা (النذر)
وَلْيُوفُوا نُذُورَهُمْ
অনুবাদ: "এবং তারা যেন তাদের মানতসমূহ পূর্ণ করে।" (সূরা হজ, আয়াত: ২৯)
হাদীস: "যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করার মানত করে, সে যেন তা পূর্ণ করে।" (সহীহ বুখারী)
দ্বিতীয় অবস্থা: পশুকে নির্দিষ্ট করা (تعيين الأضحية) যদি কেউ কোনো পশুকে কোরবানীর জন্য নির্দিষ্ট করে ফেলে (মুখে বলে বা কাজের মাধ্যমে), তবে তা জবাই করা তার ওপর আবশ্যক হয়ে পড়ে।
, হাদীস ও আয়াত (কোরবানীর পশুর গুণাগুণ):
নবী করীম (সা.) কোরবানী করার জন্য কেমন পশু পছন্দ করতেন, তার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে:
أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ كَانَ إِذَا أَرَادَ أَنْ يُضَحِّيَ، اشْتَرَى كَبْشَيْنِ عَظِيمَيْنِ، سَمِينَيْنِ، أَقْرَنَيْنِ، أَمْلَحَيْنِ، مَوْجُوءَيْنِ...
অনুবাদ: "রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন কোরবানী করার ইচ্ছা করতেন, তখন তিনি দুটি বড়, হৃষ্টপুষ্ট, শিংযুক্ত, সাদা-কালো রঙের এবং খাসি করা দুম্বা ক্রয় করতেন।" (সুনানে ইবনে মাজাহ)
পবিত্র কুরআনের আয়াত (১):
لَن تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّىٰ تُنفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ
অনুবাদ: "তোমরা কখনোই প্রকৃত পুণ্য বা কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে (আল্লাহর পথে) ব্যয় করো।" (সূরা আলে ইমরান: ৯২)
পবিত্র কুরআনের আয়াত (২):
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنفِقُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُم مِّنَ الْأَرْضِ ۖ وَلَا تَيَمَّمُوا الْخَبِيثَ مِنْهُ تُنفِقُونَ
অনুবাদ: "হে মুমিনগণ! তোমরা যা উপার্জন করো এবং আমি যা তোমাদের জন্য ভূমি থেকে উৎপন্ন করি, তা থেকে যা উৎকৃষ্ট তা ব্যয় করো এবং তার নিকৃষ্ট অংশ ব্যয় করার সংকল্প করো না।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২৬৭)
কোরবানীর পশুর শর্তাবলি (شروط الأضحية)
কোরবানীর পশু কোরবানির উপযুক্ত হওয়ার জন্য চারটি প্রধান শর্ত যেমন:
১. চতুষ্পদ গৃহপালিত পশু হওয়া (بهيمة الأنعام):
কোরবানী অবশ্যই উট, গরু বা ছাগল (ভেড়া, দুম্বা এর অন্তর্ভুক্ত) জাতীয় পশু হতে হবে।
وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَّعْلُومَاتٍ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ
অনুবাদ: "এবং তারা যেন নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে ওইসব চতুষ্পদ জন্তুর ওপর যা তিনি তাদের রিযিক হিসেবে দিয়েছেন।" (সূরা হজ, আয়াত: ২৮)
২. নির্দিষ্ট বয়স হওয়া (بلغت السن المعتبرة):
পশুকে অবশ্যই শরীয়ত নির্ধারিত বয়সে পৌঁছাতে হবে:
উট: ৫ বছর।
গরু: ২ বছর।
ছাগল/ভেড়া: ১ বছর (ভেড়া বা দুম্বার ক্ষেত্রে ৬ মাস হলেও চলে যদি তা দেখতে হৃষ্টপুষ্ট হয়)।
৩. দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত থাকা (السلامة من العيوب):
হাদীস শরীফ (যেসব পশু কোরবানী করা জায়েজ নয়):
বারা বিন আযিব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
أَرْبَعٌ لَا تَجُوزُ فِي الضَّحَايَا: الْعَوْرَاءُ الْبَيِّنُ عَوَرُهَا، وَالْمَرِيضَةُ الْبَيِّنُ مَرَضُهَا، وَالْعَرْجَاءُ الْبَيِّنُ ظَلْعُهَا، وَالْكَسِيرَةُ الَّتِي لَا تُنْقِي
অনুবাদ: "চার ধরনের পশু কোরবানী করা জায়েজ নয়:
(১)যে পশুর এক চোখের অন্ধত্ব স্পষ্ট,
(২) যে পশুর রোগ স্পষ্ট,
(৩)যে পশুর খোঁড়া হওয়া স্পষ্ট এবং
(৪)যে পশু এতোই দুর্বল যে তার হাড়ে মজ্জা নেই।" (সুনানে তিরমিজী ও আবু দাউদ)
এমন কোনো ত্রুটি থাকা যাবে না যা কোরবানীতে বাধা সৃষ্টি করে। যেমন: অন্ধ, অতি রুগ্ন, নেংড়া বা কান কাটা পশু কোরবানী করা জায়েজ নেই।
৪. নির্দিষ্ট সময়ে জবাই করা (وقت الذبح):
কোরবানী অবশ্যই ঈদের নামাযের পর থেকে কোরবানীর শেষ দিন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে হতে হবে।
অর্থাৎ জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোরবানি করা জায়েজ। কোরবানির প্রধান দিন হলো ১০ জিলহজ (ঈদের দিন) ঈদের নামাজের পর থেকে।
কুরবানী কার ওপর ওয়াজিব?
প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন মুসলিম নর-নারীর ওপর কুরবানী ওয়াজিব হবে যদি তিনি নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক হন।
নিসাব ও সময়:
সময়: ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত।
নিসাব: যদি কারো কাছে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি সোনা অথবা সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) তোলা রূপা থাকে।
সমন্বিত নিসাব: যদি কারো কাছে সোনা-রূপা, নগদ টাকা, ব্যবসায়িক পণ্য বা প্রয়োজন অতিরিক্ত আসবাবপত্র থাকে এবং তার মোট মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার দামের সমান হয়, তবে তার ওপর কুরবানী ওয়াজিব।
হিসাবযোগ্য সম্পদ:
* নগদ টাকা ও অলঙ্কার।
* বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজনে আসে না এমন জমি বা বাড়ি।
* ব্যবসায়িক পণ্য।
* অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র।
শরীয়তের মূল পাঁচটি লক্ষ্য বা যে গুলোকে 'মাকাসিদে খামসাহ' বলে
ইসলামী শরীয়তের বিধানগুলো মূলত এই ৫টি জিনিস রক্ষার জন্যই দেওয়া হয়েছে:
- দীন রক্ষা (الدين)
- জীবন রক্ষা (النفس)
- বংশগতি বা পরিবার রক্ষা (النسل)
- সম্পদ রক্ষা (المال)
- বুদ্ধি বা বিবেক রক্ষা (العقل)
যা বিধানদাতার (আল্লাহর) পক্ষ থেকে সকল বা অধিকাংশ বিধানের মধ্যেই লক্ষ্য করা যায়।"
মোট কথা "ইসলামী শরীয়ত দুনিয়া ও আখেরাতে মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য এসেছে।
শরীয়তের যেকোনো আইন বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে সেটি হয় কোনো উপকার বয়ে আনছে, অথবা কোনো ক্ষতি থেকে মানুষকে বাঁচাচ্ছে।
কোরবানিও এমন একটা বিধান যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় দুনিয়া, আখেরাত,সমাজ প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন এমনকি অর্থনৈতিক দিক থেকেও বড় কল্যাণ নিহিত রয়েছে।
কোরবানী কেবল একটি পশু জবাই নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে আখেরাতের মহত্ত্ব: কোরবানী একটি মহান এবাদত যা আল্লাহর প্রতি চূড়ান্ত আনুগত্য এবং তাঁর নৈকট্য লাভের মাধ্যম। যখন একজন মুমিন এর মর্মার্থ বোঝে, তখন তার এবাদত আরও প্রাণবন্ত হয়।
যার মাধ্যমে
- (১)তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা বা আল্লাহর নাম নেওয়া (তাসমিয়াহ)
- (২) আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা
- (৩) আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য এবং তাক্বওয়া অর্জন
- (৪)ত্যাগের মহিমা স্মরণ করার মতো গভীর
উদ্দেশ্য রয়েছে।
১. প্রথম উদ্দেশ্য পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহ
আয়াত (১):
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
"অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামায পড়ুন এবং কোরবানী করুন।" (সূরা আল-কাউসার: ০২)
আয়াত (২):
وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ فَإِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَلَهُ أَسْلِمُوا وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ
"আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানীর নিয়ম করে দিয়েছি; যাতে তারা আল্লাহর দেওয়া চতুষ্পদ জন্তু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে। তোমাদের উপাস্য তো একমাত্র উপাস্য, সুতরাং তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণ করো এবং সুসংবাদ দাও বিনীতদেরকে।" (সূরা আল-হজ: ৩৪)
আয়াত (৩):
لِيَشْهَدُوا مَنَافِعَ لَهُمْ وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَعْلُومَاتٍ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ
"যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর দেওয়া চতুষ্পদ জন্তু যবেহ করার সময় তাঁর নাম স্মরণ করে। অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার করো এবং দুস্থ-দরিদ্রদের আহার করাও।" (সূরা আল-হজ: ২৮)
২.দ্বিতীয় উদ্দেশ্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা
আয়াত (১):
كَذَٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ ۗ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ
"এভাবেই তিনি এগুলোকে (কোরবানীর পশুকে) তোমাদের অনুগত করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো এই জন্য যে, তিনি তোমাদের পথপ্রদর্শন করেছেন। সুতরাং আপনি সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ দিন।" (সূরা আল-হজ: ৩৭)
আয়াত (২):
وَقُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي لَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا وَلَمْ يَكُن لَّهُ شَرِيكٌ فِي الْمُلْكِ وَلَمْ يَكُن لَّهُ وَلِيٌّ مِّنَ الذُّلِّ ۖ وَكَبِّرْهُ تَكْبِيرًا
"এবং বলুন: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি, রাজত্বে তাঁর কোনো শরীক নেই এবং যিনি দুর্দশাগ্রস্ত হন না যে কারণে তাঁর কোনো সাহায্যকারীর প্রয়োজন হতে পারে। সুতরাং আপনি সগৌরবে তাঁর মাহাত্ম্য ঘোষণা করুন।" (সূরা আল-ইসরা: ১১১)
৩.তৃতীয় উদ্দেশ্য আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য এবং তাক্বওয়া অর্জন
আয়াত (১):
ذَٰلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ
"এটাই হলো আল্লাহর বিধান; আর কেউ আল্লাহর নিদর্শনাবলিকে (কোরবানীর পশুকে) সম্মান করলে সেটা তো তার হৃদয়ের তাকওয়া বা আল্লাহভীতিরই বহিঃপ্রকাশ।" (সূরা আল-হজ: ৩২)
আয়াত (২)
لَن يَنَالَ ٱللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَآؤُهَا وَلَـٰكِن يَنَالُهُ ٱلتَّقْوَىٰ مِنكُمْۚ كَذَٲلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُواْ ٱللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَٮٰكُمْۗ وَبَشِّرِ ٱٱلْمُحْسِنِينَ
আল্লাহর কাছে পৌছায় না সেগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং তার কাছে পৌছায় তোমাদের তাকওয়া।(১) এভাবেই তিনি এদেরকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এজন্য যে, তিনি তোমাদেরকে হেদায়াত করেছেন; কাজেই আপনি সুসংবাদ দিন সৎকর্মপরায়ণদেরকে।
২. হাদীস শরীফ
مَا عَمِلَ آدَمِيٌّ مِنْ عَمَلٍ يَوْمَ النَّحْرِ أَحَبَّ إِلَى اللَّهِ مِنْ هِرَاقَةِ الدَّمِ، إِنَّهُ لَيَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِقُرُونِهَا وَأَشْعَارِهَا وَأَظْلَافِهَا، وَأَنَّ الدَّمَ لَيَقَعُ مِنَ اللَّهِ بِمَكَانٍ قَبْلَ أَنْ يَقَعَ مِنَ الْأَرْضِ، فَطِيبُوا بِهَا نَفْسًا
"কোরবানীর দিনে রক্ত প্রবাহিত করার (পশু জবাই) চেয়ে আদম সন্তানের অন্য কোনো আমল আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় নয়। কিয়ামতের দিন কোরবানীর পশু তার শিং, পশম ও খুরসহ উপস্থিত হবে। পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা প্রফুল্ল চিত্তে কোরবানী করো।" (সুনানে তিরমিজী ও ইবনে মাজাহ)
৪.চতুর্থ উদ্দেশ্য (ত্যাগের মহিমা)
আয়াত (১):
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ * لَا شَرِيكَ لَهُ ۖ وَبِذَٰلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ
"বলুন: আমার নামায, আমার কোরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহরই জন্য। তাঁর কোনো শরীক নেই। আমি এরই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলিম।" (সূরা আল-আন'আম:
(১৬২-১৬৩)
আল্লাহ তায়ালার আদেশ, হযরত ইব্রাহিম এবং ইসমাঈল আঃ পিতাপুত্রের বাস্তবায়ন,ত্যাগের অপূর্ব নমুনা।
فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعۡىَ قَالَ يٰبُنَىَّ اِنِّىۡۤ اَرٰى فِى الۡمَنَامِ اَنِّىۡۤ اَذۡبَحُكَ فَانْظُرۡ مَاذَا تَرٰىؕ قَالَ يٰۤاَبَتِ افۡعَلۡ مَا تُؤۡمَرُ سَتَجِدُنِىۡۤ اِنۡ شَآءَ اللّٰهُ مِنَ الصّٰبِرِيۡنَ ١٠٢فَلَمَّاۤ اَسۡلَمَا وَتَلَّهٗ لِلۡجَبِيۡنِۚ ١٠٣
وَنَادَيۡنٰهُ اَنۡ يّٰۤاِبۡرٰهِيۡمُۙ ١٠٤قَدۡ صَدَّقۡتَ الرُّءۡيَا ۚ اِنَّا كَذٰلِكَ نَجۡزِى الۡمُحۡسِنِيۡنَ ١٠٥
(সূরা সাফ্ফাত আয়াত ১০১-১০৭)
অতঃপর (ইসমাঈল)সে যখন তার পিতার সাথে চলাফিরা করার বয়সে পৌঁছল, তখন ইবরাহীম (আঃ) বলল,হে ‘বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবেহ করছি, এখন বল, তোমার অভিমত কী? সে বলল, ‘আব্বু ! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুন, আল্লাহ ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীলই পাবেন।
দু’জনেই যখন আনুগত্যে মাথা নুইয়ে দিল। আর ইবরাহীম তাকে (ইসমাঈলকে)উপুড় ক’রে শুইয়ে দিল।
তখন আমি তাকে ডাক দিলাম, ‘হে ইবরাহীম!
স্বপ্নে দেয়া আদেশ তুমি সত্যে পরিণত করেই ছাড়লে।
(তুমি আমার দেওয়া পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছো ফলস্বরূপ )এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি।
হাদীস
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ ذَبَحَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ الذَّبْحِ كَبْشَيْنِ أَقْرَنَيْنِ أَمْلَحَيْنِ مُوجَأَيْنِ فَلَمَّا وَجَّهَهُمَا قَالَ " إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ عَلَى مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ إِنَّ صَلاَتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَاىَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ لاَ شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ اللَّهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ عَنْ مُحَمَّدٍ وَأُمَّتِهِ بِاسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ " . ثُمَّ ذَبَحَ
কুরবানীর প্রকৃত দর্শন: কৃতজ্ঞতা ও মালিকানা স্বীকার
কুরবানী শুধুমাত্র একটি পশু জবাই করার প্রথা নয়, বরং এটি স্রষ্টার প্রতি সৃষ্টির পরম আনুগত্যের একটি বহিঃপ্রকাশ। আবু দাউদ শরীফের ২৭৯৫ নম্বর হাদীসের আলোকে এর মূল শিক্ষাগুলো নিম্নরূপ:
১. অন্তরে বড়ত্ব ও কাজে ঘোষণা
একজন মুমিনের প্রধান কাজ হলো অন্তরে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বকে (তাকবীর) লালন করা। কিন্তু কেবল মনে বিশ্বাস রাখাই যথেষ্ট নয়; বরং কুরবানীর মাধ্যমে পশুর রক্ত প্রবাহিত করে এবং মুখে "আল্লাহু আকবার" ধ্বনি দিয়ে সেই শ্রেষ্ঠত্বের প্রকাশ্য ঘোষণা দিতে হয়। এটি প্রমাণ করে যে, মানুষের ইচ্ছা ও পছন্দ আল্লাহর হুকুমের সামনে সমর্পিত।
২. নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
আল্লাহ তাআলা মহাবিশ্বের বিশাল সৃষ্টিজগতকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন। গৃহপালিত পশুদের ওপর মানুষকে যে নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে, তা মানুষের নিজস্ব কোনো শক্তিতে নয়, বরং আল্লাহর বিশেষ দান। এই বিশাল নেয়ামতের শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা আদায়ের একটি অন্যতম পদ্ধতি হলো তাঁর নির্দেশিত পথে কুরবানী করা।
৩. মালিকানা অধিকারের স্বীকৃতি
মানুষ যখন দীর্ঘদিন কোনো কিছু ভোগ করে, তখন অবচেতন মনে সে নিজেকেই সেই জিনিসের প্রকৃত মালিক ভাবতে শুরু করে। কুরবানীর সময় যখন বলা হয়—"হে আল্লাহ! এটি তোমারই সম্পদ এবং তোমারই জন্য নিবেদিত"— তখন মানুষের এই ভ্রম দূর হয়। এটি একটি স্বীকৃতি যে:
পশুটির প্রকৃত মালিক আমি নই, বরং আল্লাহ।
আল্লাহর দেওয়া সম্পদ তাঁরই রাস্তায় খরচ করার মাধ্যমে আমরা আমাদের বিনয় প্রকাশ করছি।
৪. আত্মশুদ্ধি ও ত্যাগের শিক্ষা
কুরবানীর পশু জবাই করার অর্থ হলো নিজের ভেতরকার আমিত্ব, অহংকার এবং পশুত্বকে বিসর্জন দেওয়া। পশুর গলায় ছুরি চালানোর আগে নিজের মনের এই ঘোষণাটি অত্যন্ত জরুরি যে, "আমার জীবন, আমার মরণ, আমার ইবাদত এবং আমার কুরবানী— সবকিছুই বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।"
৫. হাদীসের শিক্ষা
রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন কুরবানীর পশু জবাই করার জন্য শোয়ালেন, তখন ইব্রাহিম (আ.)-এর অনুসরণে তাওহীদের ঘোষণা দিলেন এবং শেষে এই বাক্যটি বললেন। এর মাধ্যমে এটিই স্বীকার করা হয় যে, এই পশুটি আল্লাহর দান এবং এটি তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করা হচ্ছে।
"আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাকা" (হে আল্লাহ, এটি আপনার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এবং আপনারই জন্য)। এই একটি বাক্যই কুরবানীর সমস্ত উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে দেয়। আমাদের সম্পদ আসলে আমাদের নয়, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত মাত্র।
উপসংহার:
কুরবানী আমাদের শেখায় যে, সম্পদ বা পশু বড় কথা নয়, বরং কুরবানীর পেছনে থাকা 'তাকওয়া' বা আল্লাহর ভয়ই আসল। আমরা যেন কখনো ভুলে না যাই যে, আমাদের সামর্থ্য ও কর্তৃত্ব সবই আল্লাহর দেওয়া উপহার। সেই উপহারকে তাঁরই নামে উৎসর্গ করাই হলো প্রকৃত মুমিনের পরিচয়।
--------------------
আলোচনা সমন্বয় ও বিশ্লেষণ তোফায়েল আহমাদ

0 মন্তব্যসমূহ