ব্রম্মপুত্র নদীর পানির প্রবাহ কমে যাওয়া,স্বাভাবিক বৃষ্টিতেই ঘনঘন সৃষ্ট বন্যা হওয়া। সিলেট, কুমিল্লার ঘোমতি নদীতে বন্যার কারণ কি ছিলো?
ভারত বাংলাদেশ থেকে উজানে, তারা তাদের তুলনামূলক উঁচু এলাকাগুলোতে চাষাবাদের উপযুক্ত করার জন্য পানি পৌছাতে বিভিন্ন নদীতে বাঁধ তৈরি করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য কি এটা প্রয়োজন? আমাদের জন্য করনীয় নদীর গতিপথ নিয়ন্ত্রণ রেখে প্রবাহ বাড়ানো। ছোট ছোট নদীগুলো খনন কাজ করে পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা। এতে বর্ষাকালে নদী ভাঙনের ফলে সৃষ্ট বন্যা থেকে আবাদি জমি
রক্ষা পাওয়ার সম্ভবনা বেশী হতো, অনুরূপ শুকনো সিজনে চাষাবাদের জন্য পানি ধরে রাখা যেতো।
যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
নদী বাঁধ দিয়ে সেচের পানি ব্যবস্থা করার চেয়ে নদী বা খাল খনন করে জলবদ্ধতা নিরসন এবং বন্যা থেকে ফসিল জমি রক্ষা করা প্রয়োজন।
কিন্তু বাঁধ তৈরি করে চাষাবাদ করা এটা
বাংলাদেশের জন্য কতটুকু সফল হবে?
পদ্মা কোন ছোট নদী নয়, যে নির্দিষ্ট এলাকার জন্য এতোবড় একটা নদীকে সীমাবদ্ধ করে দেওয়ার প্লান করা।
একেতো গণবসতি। আবাদি জমি কম, তাছাড়া চাষাবাদের জন্য এতো বড় নদীর প্রবাহে বাঁধা তৈরী করা নদীর স্বাভাবিক বহমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অনেকটা পদ্মা নদীর বর্তমান অবস্থার মতো। যেখানে ব্রিজ করা হয়েছে সেখানে পলি মাটি জমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাঁধা তৈরী হচ্ছে। তবে যাতায়াত এবং যোগাযোগের জন্য পদ্মা নদীর সেতু প্রয়োজন ছিলো।
পদ্মা সেতুর প্রয়োজনীয়তা ছিল অনস্বীকার্য কারণ এটি ২১টি জেলাকে যুক্ত করেছে। যাতায়াত ও অর্থনীতির জন্য এটি একটি সফল বিনিয়োগ। কিন্তু যাতায়াতের জন্য ব্রিজ আর চাষাবাদের জন্য ব্যারেজ—এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকায় ঘনঘন বন্যার কারণ
সাধারণ বৃষ্টিতেই এখন বড় ধরনের বন্যা হওয়ার পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ কাজ করছে:
পলি ভরাট ও নাব্য সংকট: ব্রহ্মপুত্র ও তার শাখা নদীগুলো হিমালয় থেকে প্রচুর পলি বয়ে আনে। বছরের পর বছর ড্রেজিং না হওয়ায় নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। ফলে এখন অল্প বৃষ্টিতেই নদী উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে।
সিলেটের আকস্মিক বন্যা (Flash Flood): সিলেটের বন্যার প্রধান কারণ হলো মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জির পাহাড়ী ঢল। আগে হাওরগুলো এই পানি ধরে রাখত, কিন্তু এখন হাওরে অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট ও বাঁধ নির্মাণের ফলে পানি প্রবাহে বাধা পাচ্ছে, যা দ্রুত জনপদ ডুবিয়ে দিচ্ছে।
গোমতী নদীর চ্যালেঞ্জ: কুমিল্লার গোমতী নদীকে বলা হয় 'কুমিল্লার দুঃখ'। এর কারণ হলো ভারতের ত্রিপুরা থেকে আসা তীব্র ঢল। উজানে যখন অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে বাঁধের গেট খুলে দেওয়া হয়, তখন গোমতীর সরু ও পলিযুক্ত খাত সেই বিশাল পানিপ্রবাহ নিতে পারে না, ফলে বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা হয়।
উজানে বাঁধ বনাম বাংলাদেশের বাস্তবতা
ভারত উজানে বাঁধ দিয়ে পানি সরিয়ে নিচ্ছে তাদের উঁচু এলাকাগুলোকে চাষাবাদের আওতায় আনতে। কিন্তু বাংলাদেশ যেহেতু ভাটির দেশ, আমাদের পরিস্থিতি ভিন্ন:
বাঁধ আমাদের জন্য কেন ক্ষতিকর: বাংলাদেশ পললভূমি দিয়ে গঠিত। এখানে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করলে পলি জমা হওয়ার হার বেড়ে যায়। পদ্মা বা ব্রহ্মপুত্রের মতো প্রমত্তা নদীতে বাঁধ দিলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ হবে এবং নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে চারপাশের এলাকা স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার হবে।
গণবসতি ও জমি অধিগ্রহণ: আপনি যেমনটি বলেছেন, আমাদের জনসংখ্যা বেশি এবং জমি সীমিত। একটি বড় ব্যারেজ বা ড্যাম নির্মাণ করতে গেলে যে বিশাল 'রিজার্ভার' বা জলাধার তৈরি করতে হয়, তাতে হাজার হাজার একর আবাদি জমি এবং শত শত গ্রাম তলিয়ে যাবে। যা আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
টেকসই সমাধান: নদী খনন ও গতিপথ ব্যবস্থাপনা
আপনার প্রস্তাবিত "নদীর গতিপথ নিয়ন্ত্রণ রেখে প্রবাহ বাড়ানো"—এটিই হলো বাংলাদেশের জন্য আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব সমাধান। এর কর্মপরিকল্পনা এমন হতে পারে:
শাখা নদী ও খাল খনন: মূল নদীগুলোর ওপর চাপ কমাতে ছোট ছোট নদী ও খালগুলো নিয়মিত খনন করা প্রয়োজন। এতে বর্ষাকালে বাড়তি পানি এসব শাখা পথে ছড়িয়ে পড়বে, ফলে মূল নদীর পাড় ভাঙার ঝুঁকি কমবে।
প্রাকৃতিক জলাধার (Wetland Conservation): আমাদের বিল ও হাওরগুলোর মাঝ দিয়ে খাল খনন করে গভীরতা বাড়াতে হবে। এগুলো বর্ষায় পানি ধরে রাখবে (বন্যা রোধ করবে) এবং শুকনো মৌসুমে সেই পানি সেচ কাজে ব্যবহার করা যাবে, এবং বর্ষাকালে বন্যা থেকে ফসল রক্ষা করা যাবে।একে বলা হয় 'ন্যাচারাল বাফার'।
ড্রেজিং ও ল্যান্ড রিক্লেমেশন: নদী খনন করে যে মাটি পাওয়া যাবে, তা দিয়ে পরিকল্পিতভাবে নতুন জমি (Land) তৈরি করা সম্ভব, যা আমাদের আবাসন ও আবাদি জমির সংকট মেটাবে।
পদ্মা সেতু বনাম পদ্মা ব্যারেজ: একটি তফাত
যাতায়াতের প্রয়োজনে পদ্মা সেতু অপরিহার্য ছিল, কারণ এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিকে পাল্টে দিয়েছে। কিন্তু সেতুর পিলার যে পরিমাণ পলি জমায়, একটি পূর্ণাঙ্গ 'ব্যারেজ' বা 'বাঁধ' তার চেয়ে শতগুণ বেশি পলি জমাবে।
ব্রিজ: পানি প্রবাহে খুব সামান্য বাধা দেয়।
ব্যারেজ: নদীর পুরো বুক জুড়ে একটি দেয়াল। এটি পদ্মার মতো একটি জীবন্ত নদীকে মৃত খালে পরিণত করতে পারে।
আমাদের জন্য করণীয় কী?
বাংলাদেশের জন্য বড় বড় কংক্রিটের বাঁধ তৈরি না করে 'বেসিন ভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা' করা জরুরি:
আঞ্চলিক পানি কূটনীতি: ভারত ও নেপালের সাথে আলোচনা করে অভিন্ন নদীগুলোর পানির সঠিক হিস্যা নিশ্চিত করা।
ক্যাপিটাল ড্রেজিং: নদীগুলোকে শুধু লোকদেখানো খনন না করে বৈজ্ঞানিকভাবে গভীরতা বাড়ানো।
বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের আধুনিকায়ন: নদী শাসনের নামে নদীকে আটকে না রেখে পানি চলাচলের পথ সুগম রাখা।
পরিশেষে:
আপনার পর্যবেক্ষণটি সঠিক—পদ্মার মতো বিশাল নদীকে নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ করা আত্মঘাতী হতে পারে। বাঁধ দিয়ে চাষাবাদ নয়, বরং নদী খনন করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ও জলাধার ব্যবস্থাপনা করাই বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদী এবং সফল সমাধান। এতে প্রকৃতিও বাঁচবে, আবার মানুষও উপকৃত হবে।

0 মন্তব্যসমূহ