জিলহজ মাসের গুরুত্ব: আল্লাহ তাআলা এই মাসকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন এবং এই মাসের আমল ও সৎকর্মকে অত্যন্ত প্রিয় ঘোষণা করেছেন।
সম্মানিত মাস: আরবী বারো মাসের মধ্যে যে চারটি মাস (জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব) সম্মানিত, জিলহজ তার অন্যতম।
আরাফাত ও কোরবানীর দিন: এই মাসেই ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ হজ পালিত হয়, যাতে রয়েছে আরাফাতের দিনের মতো শ্রেষ্ঠ দিন এবং কোরবানীর মতো মহান ইবাদত।
সম্মানিত মাসসমূহ প্রসঙ্গে
إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ ۚ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنفُسَكُمْ
"নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারোটি, আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত (নিষিদ্ধ মাস)। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত দীন। সুতরাং তোমরা এই মাসগুলোতে নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।" (সূরা আত-তাওবাহ: ৩৬)
জিলহজ মাসের প্রথম দশ রাতের শপথ
وَالْفَجْرِ * وَلَيَالٍ عَشْرٍ
অনুবাদ: "শপথ ভোরের, এবং শপথ দশ রাতের (জিলহজ মাসের প্রথম দশ রাত)।" (সূরা আল-ফজর: ১-২)আল্লাহ তাআলা কোরবানীকে একটি অত্যন্ত বরকতময় সময়ে (জিলহজ মাসের দশ তারিখে) নির্ধারণ করেছেন। এই সময়টি একদিকে যেমন হজ্জের মাস, অন্যদিকে এটি আল্লাহর ঘোষিত চারটি সম্মানিত মাসের অন্তর্ভুক্ত। তাই এই পবিত্র সময়ে আল্লাহর জন্য কোরবানী করা কেবল একটি ইবাদত নয়, বরং এটি আল্লাহর সময় ও বিধানের প্রতি চূড়ান্ত সম্মান প্রদর্শনের নাম।
إِنَّ أَعْظَمَ الأَيَّامِ عِنْدَ اللَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى يَوْمُ النَّحْرِ ثُمَّ يَوْم الْقَرِّ
"আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলার নিকট দিনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মহান দিন হলো কোরবানীর দিন (১০ই জিলহজ), এরপর হলো তার পরবর্তী দিন (১১ই জিলহজ, যা মিনার অবস্থানের দিন)।" (সুনানে আবু দাউদ)
আল্লাহর নিদর্শনকে সম্মান করা প্রসঙ্গে
ذَٰلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ حُرُمَاتِ اللَّهِ فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ عِندَ رَبِّهِ
"এটাই হলো আল্লাহর বিধান; আর কেউ আল্লাহর সম্মানার্হ বিষয়সমূহকে (হুরমাতুল্লাহ) সম্মান করলে তার প্রতিপালকের নিকট তা তার জন্য কল্যাণকর।" (সূরা আল-হজ: ৩০)
হৃদয়ের তাকওয়া প্রসঙ্গে
ذَٰلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ
"এটাই আল্লাহর বিধান; আর কেউ আল্লাহর নিদর্শনাবলিকে সম্মান করলে তা তো তার হৃদয়ের তাকওয়া বা খোদাভীতিরই বহিঃপ্রকাশ।" (সূরা আল-হজ: ৩২)
আল্লাহ তাআলা কোরবানীকে একটি অত্যন্ত বরকতময় সময়ে (জিলহজ মাসের দশ তারিখে) নির্ধারণ করেছেন। এই সময়টি একদিকে যেমন হজ্জের মাস, অন্যদিকে এটি আল্লাহর ঘোষিত চারটি সম্মানিত মাসের অন্তর্ভুক্ত। তাই এই পবিত্র সময়ে আল্লাহর জন্য কোরবানী করা কেবল একটি ইবাদত নয়, বরং এটি আল্লাহর সময় ও বিধানের প্রতি চূড়ান্ত সম্মান প্রদর্শনের নাম।
তাকবীরের শ্লোগান: এই দিনগুলোতে রাস্তাঘাট ও বাজারে উচ্চস্বরে তাকবীর বলা একটি গুরুত্বপূর্ণ شعار (নিদর্শন), যা আল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শনকে নিশ্চিত করে।
হাদীস শরীফ (বিদায় হজ্জের ভাষণ)
إِنَّ دِمَاءَكُمْ، وَأَمْوَالَكُمْ، وَأَعْرَاضَكُمْ، بَيْنَكُمْ حَرَامٌ، كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا، فِي شَهْرِكُمْ هَذَا، فِي بَلَدِكُمْ هَذَا، لِيُبَلِّغِ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ
"নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত (জীবন), তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের ইজ্জত-সম্মান তোমাদের পরস্পরের জন্য হারাম (পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয়); যেমন পবিত্র তোমাদের আজকের এই দিনটি (কোরবানীর দিন), তোমাদের এই মাসটি (জিলহজ মাস) এবং তোমাদের এই শহরটি (মক্কা)। উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির নিকট এই বার্তা পৌঁছে দেয়।"
আরাফাতের দিন ও কোরবানীর দিন: এই দিনটি "ইয়াওমুল হাজ্জিল আকবার" বা শ্রেষ্ঠ হজ্জের দিন হিসেবে পরিচিত। এই দিনে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তির এবং গুনাহ মাফের ঘোষণা দেন।
ইব্রাহীম (আ.)-এর স্মৃতি: এই দিনে কোরবানী করার মাধ্যমে মূলত ইব্রাহীম (আ.)-এর সেই মহান ত্যাগের স্মৃতিকে স্মরণ করা হয়, যখন তিনি আল্লাহর নির্দেশে নিজ পুত্রকে জবাই করতে উদ্যত হয়েছিলেন।
সারসংক্ষেপ: আল্লাহ তাআলা যেভাবে জিলহজ মাসের কোরবানীর দিনকে সর্বোচ্চ মর্যাদা ও পবিত্রতা দান করেছেন, ঠিক তেমনি একজন মুমিনের কাছে অন্য মুমিনের জীবন, সম্পদ এবং মান-সম্মানকেও অত্যন্ত পবিত্র ও নিরাপদ করেছেন। এই মাসটি কেবল পশু জবাইয়ের দিন নয়, বরং আল্লাহর দাসত্ব স্বীকার এবং ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠার এক মহান মূহুর্ত। আমল এবং ইবাদত করে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করার সুযোগ।
হাদীস শরীফ:
إِذَا دَخَلَتِ الْعَشْرُ وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ فَلَا يَمَسَّ مِنْ شَعَرِهِ شَيْئًا
"যখন (জিলহজ মাসের) দশ দিন শুরু হয় এবং তোমাদের কেউ কোরবানী করার ইচ্ছা করে, সে যেন তার চুল ও নখের কিছুই স্পর্শ না করে (না কাটে)।" (সহীহ মুসলিম)
হাদীস শরীফ:
إِنَّ أَعْظَمَ الْأَيَّامِ عِنْدَ اللَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى يَوْمُ النَّحْرِ... অনুবাদ: "আল্লাহ তাআলার নিকট দিনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মহান দিন হলো কোরবানীর দিন।" (সুনানে আবু দাউদ)
জিলহজ মাসের প্রথম ৯ দিন রোজা রাখার আমল
রাসুলুল্লাহ (সা.) জিলহজ মাসের প্রথম ৯ দিন রোজা রাখতেন। তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে:
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ تِسْعَ ذِي الْحِجَّةِ، وَيَوْمَ عَاشُورَاءَ، وَثَلَاثَةَ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ
অর্থ: "রাসুলুল্লাহ (সা.) জিলহজের প্রথম নয় দিন, আশুরার দিন (মহররমের ১০ তারিখ) এবং প্রতি মাসের তিন দিন (আইয়ামে বিজের) রোজা রাখতেন।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ২৪৩৭)
পুরো ৯ দিন রোজা রাখতে না পারলেও ৯ই জিলহজ অর্থাৎ ‘আরাফার দিনের’ রোজাটি কোনোভাবেই মিস করা উচিত নয়। হাজি সাহেবরা ব্যতীত বিশ্বের অন্যান্য মুসলিমদের জন্য এই রোজা রাখা সুন্নত এবং এর ফজিলত অপরিসীম।
আরাফার দিনের (৯ই জিলহজ) রোজার ফজিলত।
জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর থেকে ১ তারিখ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। ১০ জিলহজ পবিত্র ঈদুল আজহা (কোরবানির ঈদ) হওয়ায় সেদিন রোজা রাখা হারাম বা নিষিদ্ধ।
আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে সহিহ মুসলিমের হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ الَّتِي بَعْدَهُ
অর্থ: "আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে, তিনি এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১১৬২)
রোজা রাখার নিয়ম ও সময়
কবে রাখবেন: চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে জিলহজ মাসের ১ তারিখ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত এই রোজাগুলো রাখতে হয়।
নিয়ত ও সময়: অন্যান্য নফল বা সুন্নাত রোজার মতোই শেষ রাতে সাহরি খেয়ে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা পালন করতে হয়। মনে মনে এই নিয়ত করলেই হবে যে, "আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জিলহজ মাসের নফল/সুন্নাত রোজা রাখছি।"
জিলহজের প্রথম ১০ দিনে আমলের গুরুত্ব
এই দিনগুলোতে যেকোনো নেক আমল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়, যার মধ্যে রোজাও অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
مَا مِنْ أَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيهَا أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ. يَعْنِي أَيَّامَ الْعَشْرِ. قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ؟ قَالَ: وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، إِلَّا رَجُلٌ خَرَجَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَلَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذَلِكَ بِشَيْءٍ
অর্থ: "এই দিনগুলোর (অর্থাৎ জিলহজের প্রথম ১০ দিনের) নেক আমলের চেয়ে আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় আর কোনো দিনের আমল নেই।" সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, "হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর পথে জিহাদও কি (এর চেয়ে উত্তম) নয়?" তিনি বললেন, "আল্লাহর পথে জিহাদও নয়; তবে সেই ব্যক্তির কথা ভিন্ন, যে নিজের জান ও মাল নিয়ে জিহাদে বের হয়েছে এবং এর কোনো কিছু নিয়েই আর ফিরে আসেনি (অর্থাৎ শহীদ হয়েছে)।" (সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৯৬৯)
বেশি বেশি জিকির করার নির্দেশ
রোজা রাখার পাশাপাশি জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন বেশি বেশি জিকির-আজকার করা উচিত। বিশেষ করে:
তাকবির, তাহমিদ ও তাহলিল: বেশি বেশি ‘আল্লাহু আকবার’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ এবং ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়া।এই দিনগুলোতে রোজা রাখার পাশাপাশি মুখে বেশি বেশি জিকির বা তাসবিহ পাঠ করার ব্যাপারে নবীজী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন:
مَا مِنْ أَيَّامٍ أَعْظَمُ عِنْدَ اللَّهِ وَلَا أَحَبُّ إِلَيْهِ الْعَمَلُ فِيهِنَّ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ الْعَشْرِ فَأَكْثِرُوا فِيهِنَّ مِنَ التَّهْلِيلِ وَالتَّكْبِيرِ وَالتَّحْمِيدِ
অর্থ: "আল্লাহর কাছে জিলহজের প্রথম ১০ দিনের চেয়ে মহান আর কোনো দিন নেই এবং এই দিনগুলোর নেক আমল তাঁর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। সুতরাং তোমরা এই দিনগুলোতে বেশি বেশি তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবির (আল্লাহু আকবার) ও তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ) পাঠ করো।" (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং: ৫৪৪৪)
তাকবীরে তাশরিক:
৯ই জিলহজ ফজর থেকে ১৩ই জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর একবার করে তাকবীরে তাশরিক বলা ওয়াজ"
(আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ)
তাকবীরের গুরুত্ব: ইবনে হাজার (র.) এবং ইবনে তাইমিয়্যাহ (র.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী, খুশির সময় বা যেকোনো বড় বিপদের সময় তাকবীর পাঠ করা আল্লাহর বড়ত্ব ও সম্মানের বহিঃপ্রকাশ। এটি অন্তরে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব গেঁথে দেয় এবং শয়তানের প্ররোচনা থেকে রক্ষা করে।

0 মন্তব্যসমূহ