১. ভূমিকা
প্রতি বছর মে মাসের ১ তারিখে সারা বিশ্বে আড়ম্বরপূর্ণভাবে "বিশ্ব শ্রমিক দিবস" পালন করা হয়। মিছিল, মিটিং আর স্লোগানের মাধ্যমে শ্রমিকের অধিকারের কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র বড়ই করুণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। বাস্তবে শ্রমিকের ঘাম, পরিশ্রম এবং ত্যাগের মূল্যায়ন আজও অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে, যখন দুনিয়াজুড়ে দাসপ্রথা আর শ্রম শোষণের জয়জয়কার ছিল, তখন ইসলাম শ্রমিকের যে মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করেছে, তা আজও অতুলনীয়। ইসলামে শ্রম কেবল জীবিকা অর্জনের পথ নয়, বরং এটি একটি মহান ইবাদত।
২. শ্রমিক অবহেলার পাত্র নয়: সাম্যের বিধান
আমাদের সমাজে বর্তমানে শ্রমজীবী মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। পেশার ভিন্নতার কারণে মানুষকে ছোট বা বড় মনে করা হয়। অথচ পবিত্র কুরআন এই আভিজাত্যের অহংকারকে চূর্ণ করে দিয়েছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا ۚ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ
অর্থ: "হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলকে এক পুরুষ ও এক নারী হতে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অন্যকে চিনতে পার। প্রকৃতপক্ষে তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচাইতে বেশি মর্যাদাবান সেই, যে তোমাদের মধ্যে সবচাইতে বেশি মুত্তাকী।" (সূরা হুজরাত: ১৩)
এই আয়াতের শিক্ষা হলো, মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি তার পেশা, অর্থ বা বংশ নয়; বরং তার তাকওয়া বা খোদাভীতি। একজন শ্রমিক যদি সৎ এবং পরহেজগার হন, তবে তিনি আল্লাহর কাছে একজন পাপিষ্ঠ কোটিপতির চেয়েও বেশি সম্মানিত।
৩. শ্রম: জীবিকা ও ইবাদতের সমন্বয়
ইসলাম অলসতাকে পছন্দ করে না। হাত পেতে ভিক্ষা করার চেয়ে কষ্ট করে হালাল পথে উপার্জন করাকে ইসলাম শ্রেষ্ঠ ইবাদত হিসেবে গণ্য করেছে।
কুরআনের নির্দেশ:
আল্লাহ তাআলা মানুষকে জমিনে ছড়িয়ে পড়ে কাজ করার নির্দেশ দিয়ে বলেন:
هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ ذَلُولًا فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِن رِّزْقِهِ ۖ وَإِلَيْهِ النُّشُورُ
অর্থ: "তিনিই তোমাদের জন্য পৃথিবীকে অনুগত করে দিয়েছেন; অতএব তোমরা এই পৃথিবীর পথে-প্রান্তরে চলাফেরা করো এবং তাঁর দেওয়া রিজিক থেকে আহার করো। আর তাঁর কাছেই তোমাদের পুনরুত্থান হবে।" (সূরা মুলক: ১৫)
﴿ فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِن فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ﴾
[ الجمعة: 10]
নামায সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান কর, ও আল্লাহকে অধিকরূপে স্মরণ কর; যাতে তোমরা সফলকাম হও।
[এর অর্থ বৈষয়িক কাজ-কর্ম ও ব্যবসা-বাণিজ্য। অর্থাৎ, নামায শেষ করার পর তোমরা পুনরায় নিজ নিজ কাজে-কামে এবং দুনিয়ার ব্যস্ততায় লেগে যাও। এ থেকে উদ্দেশ্য হল এই ব্যাপারটা পরিষ্কার করে দেওয়া যে, নামাজের জন্য কাজ-কর্ম বন্ধ রাখা যেমনটা জরুরী তেমন নামাজের পর রিজিক তালাশ করতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
হাদীসের গুরুত্ব:
হালাল উপার্জন করাকে ফরজের পর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ঘোষণা করা হয়েছে।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «طَلَبُ كَسْبِ الْحَلَالِ فَرِيضَةٌ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ»
অর্থ: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা ফরজ ইবাদতের পর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ।" (বায়হাকী)
৪. ভিক্ষাবৃত্তির নিন্দা ও স্বনির্ভরতার শিক্ষা
নবী কারীম (সা.) মানুষকে সবসময় পরিশ্রমী হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি ভিক্ষাবৃত্তিকে অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
একটি শিক্ষণীয় ঘটনা:
একদা এক আনসারী সাহাবী নবীজীর (সা.) কাছে সাহায্যের জন্য এলেন। নবীজী (সা.) তাকে ভিক্ষা না দিয়ে তার ঘরের সামান্য আসবাব বিক্রি করে একটি কুড়াল কিনে দিলেন এবং নিজ হাতে তাতে হাতল লাগিয়ে দিয়ে বললেন, "যাও, কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করো।" ১৫ দিন পর ওই ব্যক্তি হালাল উপার্জনের মাধ্যমে সচ্ছল হয়ে ফিরে এলে নবীজী (সা.) তাকে প্রশংসা করেন।
ভিক্ষাবৃত্তির ভয়াবহতা সম্পর্কে হাদীস:
১. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি সর্বদা মানুষের কাছে হাত পাততে থাকে, কিয়ামতের দিন সে এমনভাবে উঠবে যে, তখন তার মুখমন্ডলে কোনো গোশত থাকবে না।" (সহীহ বুখারী: ১৪৭৪)
২. রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন: "যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ বাড়ানোর জন্য মানুষের কাছে সম্পদ ভিক্ষা করে বেড়ায়, সে আসলে আগুনের ফুলকি ভিক্ষা করছে।" (সহীহ মুসলিম: ২২৮৯)
৫. নবীদের সুন্নত: পরিশ্রমী জীবন
সকল নবী-রাসূল কোনো না কোনো পেশার সাথে জড়িত ছিলেন। তারা নিজ হাতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন।
হযরত আদম (আ.) কৃষি কাজ করতেন।
হযরত দাউদ (আ.) বর্ম তৈরি করতেন।
হযরত মূসা (আ.) দীর্ঘ সময় অন্যের অধীনে শ্রম দিয়েছেন।
হযরত মুহাম্মদ (সা.) নবুওয়াতের পূর্বে ব্যবসা এবং ছাগল চড়াতেন।
হাদীসে এসেছে:
عَنِ الْمِقْدَامِ - رضى الله عنه - عَنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ قَالَ: «مَا أَكَلَ أَحَدٌ طَعَامًا قَطُّ خَيْرًا مِنْ أَنْ يَأْكُلَ مِنْ عَمَلِ يَدِهِ، وَإِنَّ نَبِيَّ اللَّهِ دَاوُدَ - عَلَيْهِ السَّلاَمُ - كَانَ يَأْكُلُ مِنْ عَمَلِ يَدِهِ»
অর্থ: হযরত মিকদাম (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজী (সা.) বলেছেন: "নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কেউ কখনো খায় না। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন।" (সহীহ বুখারী: ২০৭২)
৬. মালিকের দায়িত্ব ও শ্রমিকের অধিকার
ইসলামে শ্রমিক ও মালিকের সম্পর্ক হবে ভাই-ভাই। মালিক কখনোই শ্রমিককে শোষণ করতে পারবে না।
ক. মজুরী সঠিক সময়ে পরিশোধ করা:
শ্রমিকের পারিশ্রমিক নিয়ে টালবাহানা করা কবিরা গুনাহ।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «أَعْطُوا الأَجِيرَ أَجْرَهُ قَبْلَ أَنْ يَجِفَّ عَرَقُهُ»
অর্থ: "শ্রমিকের দেহের ঘাম শুকাবার পূর্বেই তোমরা তার মজুরী আদায় করে দাও।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৪৪৩)
খ. ক্ষমতার অতিরিক্ত কাজ না চাপানো:
শ্রমিকও একজন মানুষ। তার শারীরিক সক্ষমতার বাইরে কাজ চাপানো জুলুম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তাদের ওপর এমন কোনো কাজ চাপাবে না যা তাদের সামর্থ্যের বাইরে। যদি কোনো কঠিন কাজ দাও, তবে নিজেরা তাদের সাহায্য করো।"
গ. সদ্ব্যবহার ও ক্ষমাশীলতা:
মালিককে দয়ালু হতে হবে। রমজান মাসে শ্রমিকের কাজ সহজ করে দিলে আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন বলে হাদীসে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
৭. শ্রমিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য
অধিকার আদায়ের পাশাপাশি শ্রমিকেরও কিছু পবিত্র দায়িত্ব রয়েছে। ইসলাম শ্রমিককে আমানতদার ও নিষ্ঠাবান হতে শিক্ষা দেয়।
১. সততা ও নিষ্ঠা: শ্রমিককে তার উপর অর্পিত কাজ পূর্ণ বিশ্বস্ততার সাথে করতে হবে। কাজে ফাঁকি দেওয়া বা মালিকের ক্ষতি করা খিয়ানতের শামিল।
২. আমানত রক্ষা: প্রতিষ্ঠানের গোপনীয়তা এবং সম্পদ রক্ষা করা শ্রমিকের ঈমানি দায়িত্ব।
৩. মালিকের অনুগত্য: মালিকের জায়েজ নির্দেশনাবলী মেনে চলা এবং শৃঙ্খলার সাথে কাজ সম্পন্ন করা।
দ্বিগুণ সওয়াবের ঘোষণা:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিন ধরনের মানুষ দ্বিগুণ সওয়াব পাবেন। তার মধ্যে একজন হলেন:
وَالْعَبْدُ الْمَمْلُوكُ إِذَا أَدَّى حَقَّ اللَّهِ وَحَقَّ مَوَالِيهِ
অর্থ: "ওই দাস (শ্রমিক/কর্মচারী) যে আল্লাহর হক আদায় করে এবং তার মালিকের হকও আদায় করে।" (সহীহ বুখারী: ৯৭)
৮. সততার ফল: একটি অনুপ্রেরণামূলক ঘটনা (গুহার সেই তিন ব্যক্তি)
বুখারী ও মুসলিম শরীফের প্রসিদ্ধ হাদীসে তিন ব্যক্তির গুহায় আটকে পড়ার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাদের একজন তার সৎ আমলের উসিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন।
সেই ব্যক্তি একজন মজুর নিয়োগ করেছিলেন। কাজ শেষে মজুর তার পারিশ্রমিক না নিয়েই চলে যায়। মালিক সেই মজুরির টাকা দিয়ে ব্যবসা এবং পশুপালন করেন। কয়েক বছর পর সেই শ্রমিক ফিরে এসে তার পাওনা চাইলে, মালিক তাকে সেই একটি 'ফারাক' চালের পরিবর্তে তার থেকে উৎপন্ন সমস্ত গরু-ছাগলের পাল দিয়ে দেন। এই সততা ও আমানতদারীর কারণে আল্লাহ সেই গুহার মুখ থেকে পাথর সরিয়ে দিয়েছিলেন।
৯. উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ইসলাম শ্রমিককে কেবল শ্রম দেওয়ার যন্ত্র মনে করে না, বরং সমাজের মেরুদণ্ড হিসেবে সম্মান দেয়। শ্রমিক ও মালিক যদি একে অপরের হক সম্পর্কে সচেতন থাকে, তবে সমাজে কোনো অস্থিরতা থাকবে না। মালিক যদি দয়ালু হয় এবং শ্রমিক যদি বিশ্বস্ত হয়, তবে একটি আদর্শ ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের উভয় পক্ষকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।

0 মন্তব্যসমূহ