শুরুর কথা
বর্তমান সময়ে মানুষের জীবনের অন্যতম বড় সমস্যা হলো মানসিক চাপ এবং অস্থিরতা। এর অনেকগুলো কারণ থাকে তার মধ্যে বড় কারণ হলো তুলনামূলক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। যা আমাদেরকে অস্থিতিশীল করে তুলে। যেমন আমরা আমাদের বাচ্চাদের পড়াশোনার জন্য তাদের জীবন সুন্দর করার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাই। আমার মতো করে আরও অনেকের সন্তানদেরও সেই প্রতিষ্ঠানে পাঠদানের জন্য ভর্তি হয়।
তারপর শুরু হয় ভালো রেজাল্ট করা নিয়ে প্রতিযোগিতা। ছোট ছোট বাচ্চাদের পেশার দেই, অমুকের ছেলে বা মেয়ে প্রথম হয়েছে,রেজাল্টে টপ করেছে তোমাকেও ভালো করতে হবে,ফার্স্ট হতে হবে।
অথচ ভুলেই যাই আমার সন্তানকে পড়াশোনার পাশাপাশি তাকে ভালো শিষ্টাচার শিক্ষা দিতে হবে। যা তার জীবনে ভালো মানুষ হওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আবার দেখা যায় আমার পার্শ্ববর্তী কেউ ভালো ইনকাম করছে, অথবা সে অনেক সম্পদের মালিক তখন আমরা তার সাথে তুলনা করি নিজেকে সে এতো টাকার মালিক আমার কেন টাকা নেই। ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আমরা অনেক সময় পেরেশানিতে লিপ্ত হয় অথচ সাধারণভাবে জীবনযাপনের জন্য যাবতীয় বিষয় আমার আছে তবুও আমরা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লেগে যাই।
প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং প্রতিযোগিতামূলক জীবনের দৌড়ে আমরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছি। অথচ ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে যেকোনো পরিস্থিতিতে হৃদয়ে প্রশান্তি বজায় রাখা যায়। আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস এবং কিছু নির্দিষ্ট আমলের মাধ্যমে আমরা এই অশান্তি থেকে মুক্তি পেতে পারি।
১. নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত
পবিত্র কুরআন কেবল একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, এটি মানুষের আত্মার জন্য এক মহা ঔষধ। কুরআনে বলা হয়েছে, "জেনে রেখো, আল্লাহর জিকিরেই অন্তরের প্রশান্তি নিহিত।" (সূরা আর-রাদ: ২৮)। প্রতিদিন অর্থসহ কুরআন পড়ার অভ্যাস করলে মনে অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে আসে এবং জীবনের জটিলতা সহজ মনে হয়।
২. ধৈর্যের সাথে সালাত কায়েম করা
মাধ্যমে বান্দা সরাসরি মহান আল্লাহর সাথে কথোপকথন করে। আপনার দুশ্চিন্তা যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছাবে, তখন দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর দরবারে কান্না করুন। আপনার মনের সব বোঝা তাঁর ওপর ছেড়ে দিন, দেখবেন নিমিষেই হালকা অনুভব করছেন।
৩. 'তাওয়াক্কুল' বা আল্লাহর ওপর ভরসা
আমরা অনেক সময় ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করি বা অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনায় ব্যথিত হই। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে 'তাওয়াক্কুল' বা আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা। মনে রাখবেন, যা আপনার তাকদিরে আছে তা আপনার কাছে আসবেই, আর যা নেই তা শত চেষ্টাতেও আসবে না। এই বিশ্বাস আপনার দুশ্চিন্তা অর্ধেক কমিয়ে দেবে।
৪. অহেতুক তুলনা থেকে দূরে থাকা যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা।
সবকিছু থাকা সত্বেওআমরা অনেক সময় রিজিক নিয়ে হতাশ হই,
দুশ্চিন্তা করি এই নিয়ে যে, আগামীমাস বা পরবর্তী বছর কি খাবো? কিভাবে জীবনযাপন করবো? আমি চলে যাওয়ার পর আমি ছেলেসন্তান কি খাবে কি পরিধান করবে?অথচ সৃষ্টি কর্তা প্রতিটা প্রাণীকূল
সৃষ্টি করার পরই তিনি নিজেই তার রিজিকের ব্যাবস্থার দায়িত্ব নিয়েছেন। সূরা তুল হুদে ৬ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন।
وما من دابة في الارض الا علي الله رزقها ويعلم مستقرها و مستو د عها كل في كتاب ا مبين
অর্থ : জমিনে অবস্থানরত সকল প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহরই এবং সকলের স্থায়ী- অস্থায়ী অবস্থান সম্পর্কে অবহিত। সবকিছু সুস্পষ্ট কিতাবে( লাওহে মাহফুজে) রয়েছে।
সকলের রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহর উপর ন্যস্ত”। একথা সুস্পষ্ট যে তিনি নিজেই অনুগ্রহ করে আমাদেরকে রিযিক আশ্বস্ত করেছেন। আর এক পরম সত্য, দাতা ও সর্বশক্তিমান সত্তার ওয়াদা যাতে নড়চড় হওয়ার অবকাস নেই।
অন্য এক আয়াতে এসছে
إِنَّ رَبِّي يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَن يَشَاءُ وَيَقْدِرُ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ} {سبأ: 36}.
নিশ্চয়ই আমার রব যাকে ইচ্ছে রিযিক প্রশস্ত করেন আবার যাকে ইচ্ছে তার রিযিক সংকোচিত করেন। অধিকাংশ মানুষই জানেই না কেন রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং সংকোচিত করেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই যুগে আমরা অন্যদের চাকচিক্যময় জীবন দেখে নিজের জীবনের অভাবগুলো নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا نَظَرَ أَحَدُكُمْ إِلَى مَنْ فُضِّلَ عَلَيْهِ فِي الْمَالِ وَالْخَلْقِ فَلْيَنْظُرْ إِلَى مَنْ هُوَ أَسْفَلَ مِنْهُ» مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যখন তোমাদের কেউ এমন ব্যক্তিকে দেখে যাকে মাল-সম্পদে, স্বাস্থ্য-সামর্থ্যে অধিক দেয়া হয়েছে, তখন সে যেন নিজের চাইতে নিম্নমানের ব্যক্তির দিকে তাকায়। (বুখারী ও মুসলিম)
অন্য এক হাদসে এসছে
"তোমরা তোমাদের চেয়ে নিম্নবস্থায় থাকা লোকদের দিকে তাকাও (পার্থিব বিষয়ে), তবেই তোমরা আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে পারবে।" অন্যদের সাথে নিজের তুলনা বন্ধ করলে মানসিক প্রশান্তি ফিরে আসে।
শেষ কথা!
মানসিক প্রশান্তি কোনো বাইরের বস্তু নয়, এটি আমাদের অন্তরের বিশ্বাস। ইসলামের নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনা করলে এবং অল্পে তুষ্ট থাকার অভ্যাস করলে যেকোনো কঠিন সময়েও শান্ত থাকা সম্ভব। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর জিকিরের মাধ্যমে হৃদয়ের প্রশান্তি দান করুন। আমিন।

0 মন্তব্যসমূহ