আপনার যে কোন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন!01958666697 তথ্য বহুল ইসলামিক সব আলোচনা পেতে আমাদের সাথেই থাকুন! ভর্তি চলছে, ক্বারী ইয়াকুব আলী রহ. ইসলামিয়া মাদরাসা,যোগাযোগ:01609216916 🧬 জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এ নতুন বিপ্লব শুরু হতে যাচ্ছে...

ইসলামি শরিয়াহ ও আধুনিক অর্থনীতির দৃষ্টিতে মজুতদারি (এহতিকার): একটি পর্যালোচনা



মজুতদারি ও ইসলাম 

মানুষের অর্থনৈতিক ব্যাবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে এবং সম্পদ সূচক সঞ্চালন বরবাদ করার জন্য যতগুলো দূর্নীতি আছে তারমধ্যে মজুদ ব্যাবস্থা জঘন্যতম। মজুদদারীর প্রভাব এতো প্রকট হয় যে এটা দ্বারা মানবজাতিসহ অন্যান্য প্রাণীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দ্রব্যমূল্য অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়, ফলে মানুষের সাধারণ জীবনযাত্রাব্যাহত হয়।
শহর থেকে গ্রাম ধনী থেকে গরীব চাকরীজিবী,ব্যাবসায়ী, শ্রমিক সকল পেশার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই ইসলামে মজুদদারী হারাম করেছেন
প্রথমত আমি ইসলামি পরিভাষায় মজুমদারী কাকে বলে এটা নিয়ে আলোচনা করবো।
আরবিতে শব্দ হলো الاحتكار অভিধানে যার মূল পাওয়া যায় ح ك ر আর الحكر যার অর্থ হলো
الجمع والإمساك والحبس. يقال احتكر الشيء: أي جمعه وحبسه
অর্থাৎ কোন কিছুকে আকড়ে ধরে রাখা ,আবদ্ধ করে রাখা। জমা করে রাখা, মজুদ করে রাখা।
ফকিহগণের পরিভাষায় এহতিকার (মজুতদারি)
মজুতদারির উপাদান এবং শর্তাবলী নির্ধারণে ফকিহগণের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হওয়ার কারণে এর সংজ্ঞাতেও ভিন্নতা এসেছে। নিচে চার মাজহাবের আলোকে মজুতদারির সংজ্ঞা উপস্থাপন করা হলো:
১. হানাফি মাজহাব অনুযায়ী মজুতদারির সংজ্ঞা:
ইমাম কাসানি (রহ.) মজুতদারির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন: "খাদ্যদ্রব্য বা এই জাতীয় কিছু কিনে চড়া দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে আটকে রাখাই হলো এহতিকার।"
এই সংজ্ঞাগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, হানাফি ফকিহদের মতে হারাম মজুতদারি হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত রয়েছে:
°বাজার থেকে পণ্য ক্রয় করা।
°পণ্যটি মানুষের প্রধান খাদ্যদ্রব্য হওয়া।
°পণ্যটির প্রতি মানুষের অভাব বা প্রয়োজনীয়তা থাকা।

আধুনিক অর্থনীতিতে মজুতদারির (Monopoly) সংজ্ঞা:
আধুনিক অর্থনীতিতে মজুতদারি বা একচেটিয়া বাজার বলতে বোঝায়: "কোনো নির্দিষ্ট পণ্য বা সেবার উৎপাদন ও বিতরণের ওপর একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকা, যেখানে ওই পণ্যের কোনো বিকল্প থাকে না। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি পণ্যের দাম ও উৎপাদনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা লাভ করে"।
মজুতদারির প্রকারভেদ
প্রথমত:(পণ্য) ভিত্তিতে মজুতদারির প্রকারভেদ:
১. খাদ্যশস্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের মজুতদারি: এটি সবচেয়ে ক্ষতিকর এবং ফকিহদের ঐক্যমতে হারাম। কারণ এটি মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক চাহিদার সাথে জড়িত। চার মাজহাবের ইমামগণ একমত যে, শরিয়তে নিন্দনীয় মজুতদারি মূলত খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রেই ঘটে।
২. ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের মজুতদারি: এটি খাদ্য মজুতদারির মতোই হারামের অন্তর্ভুক্ত, এমনকি কখনো কখনো এটি মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য আরও বেশি ক্ষতিকর হতে পারে।
৩. কাঁচামাল ও প্রাকৃতিক সম্পদের মজুতদারি: যেমন তেল, খনিজ সম্পদ ও জ্বালানি শক্তির মজুতদারি। এই ধরনের মজুতদারি রাষ্ট্র ও সমাজের অর্থনীতির ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
৪. বিলাসবহুল পণ্যের মজুতদারি: যেসব পণ্য মানুষের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য নয়। হানাফি মাজহাব মতে, মানুষের ক্ষতি না হওয়া পর্যন্ত এই জাতীয় পণ্যের মজুতদারি হারাম নয়। তবে মালিকি, শাফিঈ ও হাম্বলি মাজহাব অনুযায়ী, যদি তা মানুষের কষ্টের কারণ হয় তবে তাও নিষিদ্ধ।
দ্বিতীয়ত: বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার ভিত্তিতে মজুতদারির প্রকারভেদ:
১. পূর্ণ মজুতদারি (Absolute Monopoly): যখন বাজারের নির্দিষ্ট কোনো পণ্যের ওপর একজনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে এবং কোনো প্রতিযোগী থাকে না।
২. আংশিক মজুতদারি (Partial Monopoly): যখন বাজারের ওপর অল্প কয়েকজন উৎপাদনকারীর নিয়ন্ত্রণ থাকে, যাকে অনেক সময় 'অলিগোপলি' বলা হয়।
৩. একচেটিয়া প্রতিযোগিতা (Monopolistic Competition): এটি পূর্ণ প্রতিযোগিতা ও একচেটিয়া বাজারের মাঝামাঝি একটি অবস্থা, যেখানে অনেক উৎপাদনকারী থাকে কিন্তু প্রত্যেকে তাদের পণ্যের স্বকীয়তার কারণে বাজারের ওপর কিছুটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
৪. ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী মজুতদারির বিধান ও দলিল
পবিত্র কোরআনের দলিলসমূহ:
وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلاَ يُنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ‏
১. আল্লাহ তাআলার বাণী: "আর যারা স্বর্ণ ও রূপা জমা করে রাখে এবং আল্লাহর পথে তা খরচ করে না, তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ দাও" (সূরা আত-তাওবা: ৩৪)।
ব্যাখ্যা: জমানো সম্পদ যেমন আটকে রাখা গুনাহ, তেমনি মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্য আটকে রাখা (এহতিকার) শাস্তির কারণ।
أَبُو هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏ "‏ يَكُونُ كَنْزُ أَحَدِكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ شُجَاعًا أَقْرَعَ ‏"‏‏.‏
হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেন, তোমাদের মধ্যে অনেকের পুঞ্জিভূত সম্পদ (যার যাকাত আদায় করা হয় না) কিয়ামতের দিন বিষাক্ত সর্পে পরিণত হবে।
২. আল্লাহ তাআলার বাণী: "তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না" (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮)।
ব্যাখ্যা: মজুতদারি বা এহতিকার মানুষের সন্তুষ্টি ছাড়া কৃত্রিমভাবে দাম বাড়িয়ে মানুষের সম্পদ লুণ্ঠনের একটি মাধ্যম, যা এই আয়াতের পরিপন্থী

মা’মার ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
8 عن معمر بن عبد الله رضي الله عنه، عن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: » لا يحتكر الا خاطي
"পাপী ছাড়া কেউ মজুতদারি করে না।"
عن عمر بن الخطاب رضي الله عنه، عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: »الجالب مرزوق والمحتكر ملعون
ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "আমদানিকারক (পণ্য সরবরাহকারী) রিজিকপ্রাপ্ত অর্থাৎ লাভবান হয় এবং মজুতদার অভিশপ্ত হয়।"
মজুতদারকে অভিশাপ দেওয়ার অর্থ হলো এটি হারাম এবং কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
عن أبي هرير رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: »من احتكر حكر يريد أن يغلي بها على المسلمين فهو رخا
"যে ব্যক্তি মুসলমানদের ওপর দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কোনো কিছু মজুত করে, তবে সে বড় ভুল বা অপরাধ করল।"
বর্তমান সময়ে আধুনিক বিশ্বে মজুতদারী শুধু ধান বা চাল গুদামজাত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তির উৎকর্ষ এবং আধুনিক বিশ্ব ব্যবস্থার ফলে এর ধরন ও কৌশলগত পরিবর্তন এসেছে।
এটাকে অনেকেই অপরাধ মনে করে না। অনেকেই বিজনেস সূত্র বলে চালিয়ে দেয়।
আধুনিক মজুতদারীর কেমন এর প্রধান দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. ডিজিটাল পদ্ধতিতে কৃত্রিম সংকট তৈরী
এসময়ে বড় বড় কোম্পানিগুলো অনেক সময় ডাটা এনালাইসিস করে বাজারের চাহিদা পর্যবেক্ষণ করে।
(Ai) বা কৃত্তিমবুদ্ধিমত্তার মধ্যমে বাজারের চহিদা যাচাই করে
সরবরাহ লাইনে সামান্য ধীরগতি এনে বা পণ্য বাজারে ছাড়ার গতি কমিয়ে দিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়, যাতে উচ্চমূল্যে মুনাফা করা যায়।
২. কর্পোরেট মনোপলি (একচেটিয়া আধিপত্য)
বিশ্বের অনেক খাতেই এখন হাতেগোনা কয়েকটি বড় কোম্পানি সব নিয়ন্ত্রণ করে। তারা নিজেদের মধ্যে এক ধরনের অঘোষিত জোট (Cartel) গঠন করে। যখন বড় কোনো কোম্পানি বাজারের সিংহভাগ পণ্য নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখে, তখন তারা নিজেদের ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করতে পারে, যা এক ধরনের আধুনিক মজুতদারী।
৩. শেয়ার বাজার ও কমোডিটি ফিউচার্স
বর্তমানে সরাসরি পণ্য গুদামজাত না করেও মজুতদারী সম্ভব। যা শেয়ার বাজারের মাধ্যমে জরা হয় (Futures Contract)-এর মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য বা জ্বালানি তেলের মালিকানা কিনে রাখা হয়। এর ফলে বাজারে তাৎক্ষণিক টান পড়ে এবং দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায়। এটাকেও মজুতদারি বলা হবে।
আধুনিক মজুতদারীর প্রভাব
আর্থিক বৈষম্য: সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং গুটিকয়েক মানুষের হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়।
মুদ্রাস্ফীতি: বাজারে পণ্যের কৃত্রিম ঘাটতির ফলে মুদ্রাস্ফীতি ঘটে, যা উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি।
মানবিক সংকট: বিশেষ করে খাদ্য ও ঔষধের মজুতদারী দরিদ্র দেশগুলোতে দুর্ভিক্ষ বা মহামারীর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।







একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ