আপনার যে কোন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন!01958666697 তথ্য বহুল ইসলামিক সব আলোচনা পেতে আমাদের সাথেই থাকুন! ভর্তি চলছে, ক্বারী ইয়াকুব আলী রহ. ইসলামিয়া মাদরাসা,যোগাযোগ:01609216916 🧬 জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এ নতুন বিপ্লব শুরু হতে যাচ্ছে...

সওমে সিত্তাহ (শাওয়ালের ছয় রোজা) ফজিলত ও আমল

 

শাওয়ালের রোজা

সওমে সিত্তাহ (শাওয়ালের ছয় রোজা) 
ইসলামি শরিয়তে ইবাদতের ধারাবাহিকতা মুমিনের আধ্যাত্মিক উন্নতির অন্যতম মাধ্যম। পবিত্র রমজান মাস আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক বিশেষ মহোৎসব, যেখানে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে একজন মুমিন নিজের গুনাহ মাফ করিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়। তবে রমজানের এই ইবাদতের আমেজ কেবল এক মাসের জন্য সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর পূর্ণতা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজার বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলত বর্ণনা করেছেন। কোরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দালিলিক প্রমাণাদি থেকে জানা যায় যে, রমজানের ফরজ রোজার সাথে শাওয়ালের এই নফল রোজাগুলো যুক্ত হলে তা আমলনামায় পুরো এক বছর রোজা রাখার সওয়াব এনে দেয়।
হাদীস ১ (সাওবান রা. হতে বর্ণিত):
عن النبي ﷺ قال: «من صام رمضان ثم أتبعه بست من شوال، فإن ذلك صيام سنة»
অনুবাদ: নবী করীম ﷺ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: "যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, অতঃপর তার পেছনে পেছনে শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাখল, তবে তা পুরো বছর রোজা রাখার সমতুল্য।"

হাদীস ২ (সাঈদ বিন মনসুর-এর বর্ণনা):
«من صام رمضان: شهر بعشرة أشهر، وصام ستة أيام بعد الفطر ذلك إتمام سنة»
অনুবাদ: "যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল (তার সওয়াব দশ মাসের সমান), এবং ঈদুল ফিতরের পর ছয়টি রোজা রাখল, তা পূর্ণ বছর পূর্ণ করার নামান্তর।"
জাবির (রা.)-এর সূত্র ধরে বর্ণনা
হাদীস ৩ (জাবির বিন আব্দুল্লাহ রা. হতে বর্ণিত):
عن جابر بن عبد الله رضي الله عنهما، أن رسول الله ﷺ قال:
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ وَسِتًّا مِنْ شَوَّالٍ، فَكَأَنَّمَا صَامَ السَّنَةَ كُلَّهَا»
অনুবাদ: হযরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল এবং শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারা বছরই রোজা রাখল।"
১. হাদীস নং ৬৯: ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল তাঁর মুসনাদে এটি বর্ণনা করেছেন।
২. হাদীস নং ৭০: ইমাম ইবনে খুজাইমা তাঁর সহীহ গ্রন্থে এটি উল্লেখ করেছেন।
৩. হাদীস নং ৭১: ইমাম নাসাঈ তাঁর সুনানে এটি বর্ণনা করেছেন।
কেন এটি পূর্ণ বছরের রোজা?
হাদীসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ইসলামে প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব ১০ গুণ করে দেওয়া হয়। যেমন পবিত্র কুরআনে এসেছে।
আল্লাহ তাআলা নেক কাজের সওয়াব ১০ গুণ বাড়িয়ে দেন। এর প্রমাণ হিসেবে কুরআনের আয়াতের দিকে ইশারা করা হয়েছে।
: مَن جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا
অনুবাদ: "যে ব্যক্তি কোনো নেক কাজ করবে, সে তার দশগুণ প্রতিদান পাবে।" (সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ১৬০)
রমজানের ৩০টি রোজা × ১০ = ৩০০ দিন (যা প্রায় ১০ মাস)।
শাওয়ালের ৬টি রোজা × ১০ = ৬০ দিন (যা ২ মাস)।
মোট: ৩০০ + ৬০ = ৩৬০ দিন (পুরো এক বছর)।
এভাবেই শাওয়ালের ৬টি রোজা রাখার মাধ্যমে একজন মুমিন সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব লাভ করেন।
«جَعَلَ اللَّهُ الْحَسَنَةَ بِعَشْرٍ، فَشَهْرٌ بِعَشَرَةِ أَشْهُرٍ، وَسِتَّةُ أَيَّامٍ بَعْدَ الْفِطْرِ تَمَامُ السَّنَةِ»
রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শোনা গেছে: "আল্লাহ তাআলা প্রতিটি নেক কাজকে (সওয়াবের দিক থেকে) দশগুণ করেছেন। সুতরাং (রমজানের) এক মাস দশ মাসের সমতুল্য, আর ঈদুল ফিতরের পর (শাওয়ালের) ছয়টি রোজা বছরের পূর্ণতা (অর্থাৎ বাকি দুই মাসের সমতুল্য)।"
উক্ত হাদীসেরই আরও একটি বর্ণনা ভঙ্গি। এখানে গাণিতিক হিসাবটি স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে:
রমজান মাসের ১ মাস × ১০ = ১০ মাস।
শাওয়ালের ৬ দিন ×১০ = ৬০ দিন বা ২ মাস।
মোট: ১০ মাস + ২ মাস = ১২ মাস বা ১ বছর।
অর্থাৎ, আল্লাহর অশেষ দয়ায় মাত্র ৩৬টি রোজা রেখেই একজন ঈমানদার সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব অর্জন করতে পারেন।
হযরত সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীস (ইমাম দারেমী ও তাবারানীর বর্ণনা)
«صِيَامُ شَهْرٍ بِعَشَرَةِ أَشْهُرٍ، وَسِتَّةُ أَيَّامٍ بَعْدَهُنَّ بِشَهْرَيْنِ، فَذَلِكَ تَمَامُ سَنَةٍ»
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "এক মাসের রোজা দশ মাসের সমতুল্য, আর তার পরবর্তী ছয় দিনের রোজা দুই মাসের সমতুল্য; এভাবে তা পূর্ণ বছরের রোজা।
শাওয়ালের ছয় রোজা ও এ বিষয়ে আলেমদের বক্তব্য
হাদীসসমূহ থেকে শাওয়ালের ছয় রোজার বিশুদ্ধতা প্রমাণিত হওয়ার পর এখন আলেমদের মতামতগুলো দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে—রমজানের কাজা রোজার আগে এই রোজা রাখা যাবে কি না, রোজাগুলো কি টানা রাখতে হবে নাকি আলাদা আলাদা রাখা যাবে— আলেমদের মাঝে কিছু মতভেদ থাকলেও তারা একমত যে, শাওয়ালের এই ছয়টি রোজা রাখা সুন্নত এবং এটি শরীয়তসম্মত।
ইমাম নববী (রহ.)-এর বক্তব্য:
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী: "যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, অতঃপর তার পেছনে শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখল, তা যেন সারা বছর রোজা রাখার সমতুল্য"—এই হাদীসটি ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, দাউদ জাহেরী এবং তাদের অনুসারীদের জন্য একটি স্পষ্ট দলিল যে, এই রোজা রাখা মুস্তাহাব (পছন্দনীয়)।
শাফেয়ী মাযহাবের যুক্তি:
ইমাম শাফেয়ী এবং তাঁর অনুসারীরা বলেন, যখন একটি বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা সুন্নত প্রমাণিত হয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষের ভুল বোঝার ভয়ে বা অধিকাংশ মানুষ তা ছেড়ে দিয়েছে বলে সেই সুন্নত ত্যাগ করা যাবে না। যেমনটা কোন কোন হানাফি আলেমদের মতামত
রোজা রাখার পদ্ধতি
আলেমদের (বিশেষ করে শাফেয়ী আলেমদের) মতে:
সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি: ঈদুল ফিতরের পরদিনই টানা ছয়টি রোজা রাখা।
বিকল্প পদ্ধতি: যদি কেউ মাসের শুরুতে না রেখে মাসের মাঝখানে বা শেষে রাখে, অথবা আলাদা আলাদা করে (ভেঙে ভেঙে) রাখে, তবুও সুন্নতের সওয়াব পাওয়া যাবে। কারণ হাদীসে নির্দিষ্ট কোনো তারিখের কথা বলা হয়নি, বরং পুরো শাওয়াল মাসের কথা বলা হয়েছে।
একটানা রাখা জরুরি নয়:
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী শাওয়ালের ৬ রোজা একটানা রাখা জরুরি নয়।
শাওয়াল মাসের যেকোনো ৬ দিন রাখা যাবে।
(ফতওয়ায়ে হিন্দিয়্যা)
হানাফি মাজহাবের অনেক আলেমের মতে—
যদি রমজানের কাযা রোজা থাকে, তাহলে আগে কাযা আদায় করা উত্তম।
এরপর শাওয়ালের ৬ রোজা রাখা ভালো।
কারণ হাদিসে বলা হয়েছে “রমজানের রোজা পূর্ণ করার পর”।

আলেমদের ঐকমত্য ও সতর্কতা:
 ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমাদ এবং অন্যান্য ফকীহরা এই রোজাকে 'মুস্তাহাব' বা অত্যন্ত পছন্দনীয় নেক আমল হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। যদিও ইমাম মালিক (রহ.) ও ইমাম আবু হানিফা (রহ.) একে ফরযের সাথে মিশে যাওয়ার আশঙ্কায় 'মাকরূহ' বলেছিলেন, কিন্তু পরবর্তী ও প্রাচীন সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমদের মতে, বিশুদ্ধ হাদীস যেহেতু বিদ্যমান এবং ঈদের দিনের বিরতি যেহেতু রমজান থেকে একে আলাদা করে দেয়, তাই এটি পালনে কোনো বাধা নেই বরং এটি একটি সুন্নাহ।
পালনের নিয়ম ও স্বাধীনতা: শাওয়ালের এই ছয়টি রোজা রাখার ক্ষেত্রে ব্যাপক নমনীয়তা রয়েছে। এটি শাওয়াল মাসের শুরুতে, মাঝখানে বা শেষে—যেকোনো সময় রাখা যায়। একাধারে (টানা) রাখা যেমন জায়েজ, তেমনি বিরতি দিয়ে ভেঙে ভেঙে রাখা বা কাজা রোজার সাথে সমন্বয় করাও জায়েজ। তবে নেক কাজে অগ্রণী হতে মাসের শুরুর দিকে রাখা অধিক উত্তম।
পরিশেষে, শাওয়ালের ছয়টি রোজা আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনদের জন্য একটি বিশেষ উপহার। সামান্য পরিশ্রমে সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব পাওয়ার এই সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়।

আল্লাহ তাআ'লা আমাদের সকলকে আমল করার তাওফিক দান করুক। আমিন।





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ