রমজান কেবল উপবাসের মাস নয়, বরং এটি মানবজাতির হেদায়েতের আলোকবর্তিকা নাযিলের মাস। মহান আল্লাহ তাআলা এই পবিত্র মাসটিকে বেছে নিয়েছেন তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ বাণী পবিত্র কুরআন নাযিলের জন্য। তবে শুধু কুরআনই নয়, ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পূর্ববর্তী প্রধান আসমানী কিতাবগুলোও এই বরকতময় মাসেই পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছিল। কেন রমজান মাসকে আসমানী কিতাব নাযিলের জন্য নির্ধারণ করা হলো? এবং এই মহাগ্রন্থগুলোর নাযিলের প্রেক্ষাপট আমাদের জন্য কী শিক্ষা বহন করে? আজকের ব্লগে আমরা রমজানের সেই অনন্য শ্রেষ্ঠত্ব ও ঐশী গ্রন্থগুলোর নাযিলের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করব।
১. রমজানের আভিধানিক সংজ্ঞা ও ফজিলত
আভিধানিক উৎস: 'রমজান' শব্দটি আরবি 'আর-রামাদ' (الرَّمَضُ) থেকে এসেছে, যার অর্থ তীব্র উত্তাপ। সূর্যের প্রচণ্ড তাপে পাথর বা বালু তপ্ত হওয়াকে আরবিতে 'রামদা' বলা হয়।নামকরণের কারণ: ইবনে দুরাইদ-এর মতে, প্রাচীন আরবরা যখন আবহাওয়া অনুযায়ী মাসের নাম রাখছিল, তখন এই মাসটি প্রচণ্ড গরমের সময়ে পড়েছিল। আল-ফাররা-এর মতে, 'রমজান' শব্দটি রোজাদারের পেটের ভেতর তৃষ্ণার তীব্রতায় সৃষ্ট দহন বা জ্বালাপোড়া থেকেও উদ্ভূত হতে পারে। কেউ কেউ বলেন
রমজান মাসের রোজা,রোজাদারের গুনাহ,পাপ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে রোজাদারকে নিষ্কলুষ ও পাপ মুক্ত করে দেয়। ফলে এ মাসকে রমজান নামে নাম করা হয়েছে। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَةٍ مِّنَ وَالْفُرْقَانِ فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ - وَمَنْ كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ -
রোজা ইসলামের পঞ্চ ভিত্তির তৃতীয় নম্বর। রোজা অনেক প্রকার রয়েছে। রোজার শ্রেণিবিভাগ
রোজা চার প্রকার যথা: (১) ফরজ রোজা। (২) ওয়াজিব রোজা। (৩) নফল রোজা। (৪) মাকরূহ রোজা।
২.পবিত্র কুরআনে রোজা ফরজ হওয়ার আলোচনা
সিয়াম বা রোজা ফরজ হওয়ার প্রেক্ষাপট
ইসলামি শরীয়তে সিয়াম সংক্রান্ত প্রথম আয়াতগুলো পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারায় অবতীর্ণ হয়েছে। এটি রাসূল (সা.)-এর মদিনায় হিজরতের পর অবতীর্ণ হওয়া প্রথম সূরাগুলোর একটি।
ঐতিহাসিক সময়কাল: ঐতিহাসিকদের মতে, হিজরি দ্বিতীয় সনের রমজান মাসে সিয়াম ফরজ করা হয়েছিল।
কুরআনের ঘোষণা: আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সম্বোধন করে বলেন: يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ -
"হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অর্জন করতে পারো।
৩.সাওম এর সংজ্ঞা
'সাওম' (الصوم) এবং 'সিয়াম' (الصيام) শব্দ দুটি 'সামা' (صام) ক্রিয়ার দুটি মূলরূপ (মাসদার)। অভিধানের বইগুলো পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, 'সাওম' শব্দটি মূলত খাবার, পানীয়, সহবাস এবং কথা বলা থেকে বিরত থাকাকে বোঝায়।
'লিসান আল-আরব' অভিধানের লেখক 'আত-তাহজিব' গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে:
"ভাষাগতভাবে 'সাওম' অর্থ কোনো কিছু থেকে বিরত থাকা এবং তা ত্যাগ করা।"
শরীআতের পরিভাষায় আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে সুবহে সাদিকের পূর্ব হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার এবং স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকার নাম ‘সাওম
اَيَّامًا مَّعۡدُوۡدٰتٍؕ فَمَنۡ كَانَ مِنۡكُمۡ مَّرِيۡضًا اَوۡ عَلٰى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنۡ اَيَّامٍ اُخَرَؕ وَعَلَى الَّذِيۡنَ يُطِيۡقُوۡنَهٗ فِدۡيَةٌ طَعَامُ مِسۡكِيۡنٍؕ فَمَنۡ تَطَوَّعَ خَيۡرًا فَهُوَ خَيۡرٌ لَّهٗ ؕ وَاَنۡ تَصُوۡمُوۡا خَيۡرٌ لَّـکُمۡ اِنۡ كُنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ ١٨٤
(রোযা) নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনের জন্য, অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে পীড়িত কিংবা মুসাফির সে অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করে নেবে এবং শক্তিহীনদের উপর কর্তব্য হচ্ছে ফিদইয়া প্রদান করা, এটা একজন মিসকীনকে অন্নদান করা এবং যে ব্যক্তি নিজের খুশীতে সৎ কাজ করতে ইচ্ছুক, তার পক্ষে তা আরও উত্তম আর সে অবস্থায় রোযা পালন করাই তোমাদের পক্ষে উত্তম, যদি তোমরা বুঝ।
সহজ বিধান: অসুস্থ বা মুসাফির (ভ্রমণকারী) হলে তাদের জন্য অন্য সময়ে রোজা রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, কারণ আল্লাহ বান্দার জন্য সহজ করতে চান, কঠিন করতে চান না।
৪.সিয়াম ফরজ হওয়ার ঐতিহাসিক স্তর
পবিত্র কুরআনে সিয়াম বা রোজা সরাসরি একবারে কঠোরভাবে ফরজ করা হয়নি, বরং এটি কয়েকটি স্তরে সম্পন্ন হয়েছে:
প্রথম স্তর: শুরুতে মুসলমানদের প্রতি মাসে তিনটি রোজা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তখন বিধান ছিল কেউ চাইলে রোজা রাখতে পারত অথবা সামর্থ্য থাকলেও রোজার বদলে একজন মিসকিনকে খাবার (ফিদয়া) দিতে পারত।
দ্বিতীয় স্তর (চূড়ান্ত বিধান): পরবর্তীতে সূরা বাকারার আয়াত (১৮৫ নং আয়াত) অবতীর্ণ হওয়ার মাধ্যমে এই সুযোগ রহিত করা হয়। নির্দেশ আসে—যে ব্যক্তি সুস্থ এবং এই মাসটি পাবে, তাকে অবশ্যই রোজা রাখতে হবে। তবে অসুস্থ বা মুসাফিরের জন্য অন্য সময়ে কাজা করার সুযোগ বহাল রাখা হয়।
সময়কাল: হিজরতের পর দ্বিতীয় হিজরি সনে রমজান মাসের রোজা ফরজ করা হয়। এটি মুমিনদের অন্তরের প্রস্তুতি ও সহনশীলতা বৃদ্ধির জন্য পর্যায়ক্রমে করা হয়েছিল।
৫.রমজান মাসের শ্রেষ্ঠত্ব কোরআন ও অন্যান্য আসমানী কিতাব সমূহ নাযিল।
১. তাওরাত: এটি সেই কিতাব যা আল্লাহ মুসা (আ.)-এর ওপর অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ স্বয়ং এটি ফলকগুলোতে (Tablets) লিখে তাঁর কাছে অর্পণ করেছিলেন। মুসা (আ.) যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে এই ফলকগুলো গ্রহণ করেন, তখন তাঁর কিতাব প্রাপ্তির সাক্ষী হিসেবে তাঁর সম্প্রদায়ের ৭০ জন ব্যক্তি উপস্থিত ছিল। এই ফলকগুলো ছিল সংখ্যায় ১৪টি, যার মধ্যে ১২টি ভেঙে যায় এবং ২টি অবশিষ্ট থাকে। এটি রমজান মাসের ৬ দিন গত হওয়ার পর অবতীর্ণ হয়েছিল।২. যাবুর: এটি আল্লাহ দাউদ (আ.)-এর ওপর অবতীর্ণ করেছিলেন। কাতাদাহ (রহ.) বলেন: "আমাদের কাছে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এটি ছিল কেবল দোয়া, আল্লাহর প্রশংসা ও মহিমা কীর্তন। এতে কোনো হালাল-হারাম, ফরজ বিধান বা শাস্তির বিধান (হুদুদ) ছিল না।" এটি রমজান মাসের ১২ দিন গত হওয়ার পর অবতীর্ণ হয় (মতান্তরে ১৮ দিন)। বর্তমানে এটি মূল অবস্থায় নেই
৩. ইনজিল: এটি আল্লাহ ঈসা ইবনে মারইয়াম (আ.)-এর ওপর অবতীর্ণ করেছিলেন। এটি রমজানের ১৩ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর অবতীর্ণ হয় (মতান্তরে ১২, ১৮ বা ১৯ দিন)।
৪. কুরআন: এটি রমজানের ২৪ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর অবতীর্ণ হয় (মতান্তরে ১৪ দিন)
মক্কা ও মদীনায় বিভিন্ন মাসে আরও অনেক কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলার বাণী: "নিশ্চয়ই আমি এটি কদরের রাতে নাযিল করেছি"—এটি নিয়ে মুসলমানদের মনে কোনো খটকা সৃষ্টি হয়নি। কারণ, বাহ্যত তারা এর উত্তর জানতেন।তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জিল এবং অন্যান্য সহীফাগুলো একবারে (সম্পূর্ণরূপে) অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু কুরআনের ক্ষেত্রে তা প্রথমে লায়লাতুল কদরে দুনিয়ার আকাশে অবস্থিত 'বায়তুল ইজ্জাহ'-তে একবারে অবতীর্ণ হয়, এরপর তা পর্যায়ক্রমে (খন্ডে খন্ডে) নাজিল হয়। এই কিতাব ও সহীফাগুলোর ওপর পাঠ্য অনুযায়ী বিশ্বাস স্থাপন করা ওয়াজিব (আবশ্যিক)।
আসমানি কিতাবসমূহ বেশ কিছু বিষয়ে একমত, যেমন:
- উৎস এক: সবগুলোই আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা।
- উদ্দেশ্য এক: মানুষের হিদায়াত।
- আকিদাগত বিষয়সমূহ: তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ।
- সার্বজনীন নিয়মাবলি: যা মানবজাতির সকল যুগে বোঝা প্রয়োজন, যেমন—পুরস্কার ও শাস্তির বিধান, ন্যায়বিচার ও ইনসাফ, দুর্নীতি ও বিচ্যুতি দূর করা, চারিত্রিক গুণাবলির প্রচার এবং অনেক ইবাদত যা পূর্ববর্তী সকল রসূল ও তাদের অনুসারীদের মধ্যে পরিচিত ছিল। সকল নবী ও রসূলগণ তাদের উম্মতদের দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।
- ইব্রাহিম (আ.)-এর সহীফা: ১লা রমজান।
- তাওরাত (মুসা আ.): ৬ই রমজান।
- যাবুর (দাউদ আ.): ১২ই রমজান (কারো মতে ১৮ই)।
- ইঞ্জিল (ঈসা আ.): ১৩ই রমজান।
- পবিত্র কুরআন: রমজানের শেষ দশকের কদরের রাতে। (সূত্র: মুসনাদে আহমাদ)
সহীফা বা ছোট পুস্তিকাগুলোর ব্যাপারে ঐকমত্য রয়েছে যে সেগুলো সংখ্যায় ১০০টি ছিল। তবে এগুলো কাদের ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল এবং সংখ্যা কত ছিল, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَةٍ مِّنَ الهدي وَالْفُرْقَانِ
পায় আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর কুরআন নাযিল করার জন্য এই সময়টিকে নির্বাচন করার মাধ্যমে। ফলে মর্যাদাপূর্ণ ও সুমহান কুরআন নাযিলের কারণেই রমজান মাস বিশেষ সম্মান ও গৌরব অর্জন করেছে।আর কুরআনের কথা বলতে গেলে, এটি নিজ গুণেই অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। কারণ এটি সর্বপ্রশংসিত ও মহিমান্বিত আল্লাহর বাণী, যাঁর সকল গুণাবলিই পরিপূর্ণ এবং যিনি সকল প্রকার ত্রুটি থেকে পবিত্র। কুরআন সত্য, কারণ কোনো অসত্য বা বাতিল এর সামনে বা পেছন থেকে আসতে পারে না। এটি একটি নূর (আলো), এর অর্থ অত্যন্ত গভীর এবং দান বা কল্যাণের দিক থেকে এটি অত্যন্ত প্রভাবশালী। কুরআনের অন্যান্য গুণাবলি কুরআনের মধ্যেই বিভিন্ন জায়গায় বর্ণিত হয়েছে।
এখানে আয়াতে কুরআনের দুটি গুণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে: এটি মানুষের জন্য
১.হেদায়াত" (পথপ্রদর্শক) এবং এতে রয়েছে "
২.সুস্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী"।
আল্লাহ কুরআনকে 'মানুষের জন্য হেদায়াত' হিসেবে বর্ণনা করেছেন, কারণ যে ব্যক্তি কুরআন বুঝবে এবং এর আদেশ-নিষেধ ও দিকনির্দেশনা অনুযায়ী আমল করবে, সে মুক্তি ও সৌভাগ্যের পথে পরিচালিত হবে।
আর একে 'হেদায়াত ও ফুরকানের (পার্থক্যকারী) সুস্পষ্ট নিদর্শন' হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে কারণ এটি এমন সব স্পষ্ট আয়াত ধারণ করে যা সত্যকে উন্মোচিত করে এবং সঠিক ও হেদায়াতের পথ দেখায়। এই পথ অনুসরণকারীকে জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছে দেয়, যা মুমিন ও নেককারদের জন্য সম্মানের আবাস। আর এই হেদায়াতের চেয়ে বড় হেদায়াত আর কী হতে পারে, যা অকাট্য প্রমাণ ও দলিলের মাধ্যমে সত্য-মিথ্যা এবং ভালো-মন্দের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়।
সুতরাং, এটি মানুষের জন্য একটি হেদায়াত এবং এই হেদায়াত এসেছে সুস্পষ্ট আয়াতের মাধ্যমে। এটি সত্য-মিথ্যা এবং ভালো-মন্দের মধ্যে একটি পার্থক্যকারী, আর এই পার্থক্যকারী বিষয়গুলোও সুস্পষ্ট আয়াতের মাধ্যমে এসেছে।
৭রমজান মাসের ফজিলত এবং এ সংক্রান্ত হাদিস
«إِذَا دَخَلَ شَهْرُ رَمَضَانَ فُتِحَتْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ، وَفُتِحَتْ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ، وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ جَهَنَّمَ، وَسُلْسِلَتِ الشَّيَاطِينُ» وفي رواية: «فُتِحَتْ أَبْوَابُ الرَّحْمَةِ».
অনুবাদ:রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যখন রমজান মাস শুরু হয়, তখন আকাশের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদেরকে শিকলবদ্ধ করা হয়।" অন্য বর্ণনায় এসেছে: "রহমতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়।"
১. শয়তানদের শিকলবদ্ধ করার অর্থ:
এর অর্থ হলো শয়তানদের আটকে রাখা হয়, বন্দি করা হয় এবং তাদের হাতে-পায়ে বেড়ি পরিয়ে দেওয়া হয়। তাদের গলায় শিকল টেনে দেওয়া হয় যাতে তারা অবাধে চলাফেরা করতে না পারে।
২. তিনটি ভিন্ন বর্ণনার তাৎপর্য:
হাদিসের তিনটি ভিন্ন পাঠ— "আকাশের দরজা খোলা", "জান্নাতের দরজা খোলা" এবং "রহমতের দরজা খোলা"—আসলে একই লক্ষ্যের দিকে ইঙ্গিত করে।
- আকাশের দরজা খোলা: এটি একটি রূপক অর্থ, যা দিয়ে বোঝানো হয় যে এই মাসে মুমিন বান্দাদের ওপর আল্লাহর অবারিত রহমত বর্ষিত হয়।
- জান্নাতের দরজা খোলা: যেহেতু জান্নাত হলো আল্লাহর রহমত প্রকাশের শ্রেষ্ঠ স্থান, তাই এই বর্ণনাটি এসেছে।
- রহমতের দরজা খোলা: এই বর্ণনাটি সরাসরি মূল উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে। এটি ক্ষমা, দোয়ার কবুলিয়ত এবং ইহকাল ও পরকালে আল্লাহর অফুরন্ত নেয়ামত ও জান্নাতের উচ্চমর্যাদাকে অন্তর্ভুক্ত করে।
সালমান আল-ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ হাদিস:
وروى البيهقي في شعب الإيمان عن سلمان الفارسي أن رسول الله ﷺ قال في خطبة له خطبها آخر يوم من شعبان، فقال: «يَا أَيُّهَا النَّاسُ، قَدْ أَظَلَّكُمْ شَهْرٌ عَظِيمٌ، شَهْرٌ مُبَارَكٌ، شَهْرٌ فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ، جَعَلَ اللهُ صِيَامَهُ فَرِيضَةً، وَقِيَامَ لَيْلِهِ تَطَوُّعاً...»
অনুবাদ: বায়হাকী ‘শুয়াবুল ইমান’-এ সালমান আল-ফারসি (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসের শেষ দিনে এক ভাষণে বলেন: "হে লোকসকল! তোমাদের মাঝে একটি মহান ও বরকতময় মাস উপস্থিত হয়েছে। এটি এমন এক মাস যাতে এমন একটি রাত (লাইলাতুল কদর) আছে যা হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ এই মাসের রোজা পালনকে ফরজ করেছেন এবং রাতের ইবাদতকে (তারাবিহ) নফল করেছেন।"
«مَنْ تَقَرَّبَ فِيهِ بِخَصْلَةٍ مِنَ الْخَيْرِ كَانَ كَمَنْ أَدَّى فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ، وَمَنْ أَدَّى فَرِيضَةً فِيهِ كَانَ كَمَنْ أَدَّى سَبْعِينَ فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ...»
অনুবাদ: "যে ব্যক্তি এই মাসে কোনো নফল কাজের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবে, সে অন্য মাসের একটি ফরজের সমান সওয়াব পাবে। আর যে ব্যক্তি এই মাসে একটি ফরজ আদায় করবে, সে অন্য মাসের সত্তরটি ফরজের সমান সওয়াব পাবে।"
অন্য এক হাদীসে এসেছে,,,,,,
«وَهُوَ شَهْرُ الصَّبْرِ، وَالصَّبْرُ ثَوَابُهُ الْجَنَّةُ، وَشَهْرُ الْمُوَاسَاةِ، وَشَهْرٌ يُزَادُ فِيهِ رِزْقُ الْمُؤْمِنِ،
অনুবাদ: "এটি ধৈর্যের মাস, আর ধৈর্যের প্রতিদান হলো জান্নাত। এটি সহমর্মিতার মাস। এটি এমন মাস যাতে মুমিনের রিজিক বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস:
وروى أحمد والنسائي عن أبي هريرة قال: قال رسول الله ﷺ: «أَتَاكُمْ رَمَضَانُ شَهْرٌ مُبَارَكٌ فَرَضَ اللهُ عَلَيْكُمْ صِيَامَهُ، تُفْتَحُ فِيهِ أَبْوَابُ السَّمَاءِ، وَتُغْلَقُ فِيهِ أَبْوَابُ الْجَحِيمِ، وَتُغَلُّ فِيهِ مَرَدَةُ الشَّيَاطِينِ...»
অনুবাদ: ইমাম আহমদ ও নাসাঈ আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমাদের কাছে রমজান এসেছে, যা একটি বরকতময় মাস। আল্লাহ তোমাদের ওপর এর রোজা ফরজ করেছেন। এতে আকাশের দরজা খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয় এবং অবাধ্য শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়।"
রমজান মাসে শেষ রাতে ক্ষমা প্রসঙ্গে
«يُغْفَرُ لِأُمَّتِهِ فِي آخِرِ لَيْلَةٍ مِنْ رَمَضَانَ . قيل : يا رسول الله أهي ليلة القدر؟ قال : لا ، وَلَكِنَّ الْعَامِلَ إِنَّمَا يُوَفَّى أَجْرَهُ إِذَا قَضَى عَمَلَهُ»
অনুবাদ: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: "রমজানের শেষ রাতে তাঁর উম্মতকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।" জিজ্ঞেস করা হলো: "হে আল্লাহর রাসূল! সেটি কি লাইলাতুল কদর?" তিনি বললেন: "না, বরং নিয়ম হলো শ্রমিক যখন তার কাজ শেষ করে, তখন তাকে তার মজুরি পূর্ণমাত্রায় দিয়ে দেওয়া হয়"।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দানশীলতা:
«كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ أَجْوَدَ النَّاسِ بِالْخَيْرِ ، وَكَانَ أَجْوَدَ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ...»
অনুবাদ: "রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল। আর রমজান মাসে তিনি যখন জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করতেন, তখন তিনি আরও অধিক দানশীল হয়ে উঠতেন"।
. রমজানে উমরাহ:
«إِنَّ عُمْرَةً فِي رَمَضَانَ تَعْدِلُ حَجَّةً»
অনুবাদ: "নিশ্চয়ই রমজান মাসের একটি উমরাহ একটি হজের সমতুল্য"।
রমজান মাসের ফজিলতের সারসংক্ষেপ
১. শয়তানদের বন্দি করার মাস।
২. আকাশের দরজা খোলার মাস।
৩. জান্নাতের দরজা খোলার মাস।
৪. জাহান্নামের দরজা বন্ধ হওয়ার মাস।
৫. রহমত ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাস।
৬. রোজাদার ও কিয়াম (তারাবিহ) পালনকারীদের ক্ষমার মাস।
সহজ কথায় মূল বিষয়:
রমজান মাস আসার সাথে সাথে আল্লাহ তায়ালা তাঁর রহমতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন, পাপের পথ (জাহান্নাম) বন্ধ করেন এবং শয়তানের প্ররোচনা কমিয়ে দেন যাতে বান্দা সহজেই ইবাদত করতে পারে।

0 মন্তব্যসমূহ