ওহে নবীন পথিক! তুমি কি জানো তোমার এই বর্তমান সময়টি একটি প্রজ্জ্বলিত প্রদীপের ন্যায়?
যাহার আলোকচ্ছটায় তুমি দিগ্বিজয় করিতে পারো, আবার অসতর্কতায় নিজের ঘরও ভস্মীভূত করিতে পারো। এই যে তোমার ধমনীতে উষ্ণ রক্তপ্রবাহ, ললাটে দীপ্ত তেজ এবং হৃদয়ে আকাশছোঁয়ার স্বপ্ন—ইহা চিরস্থায়ী নহে। ইহা বিধাতার এক বিশেষ আমানত মাত্র।
হে ষোড়শী ও হে যুবক! তোমাদের এই দেহের লাবণ্য বসন্তের পুষ্পের ন্যায়। প্রাতঃকালে যাহা সতেজ ও সুরভিত থাকে, সায়াহ্নে তাহা ধূলিসাৎ হওয়া অনিবার্য। সুতরাং যে রূপের মোহে তুমি আজ অন্ধ হইয়া বিচারবুদ্ধি বিসর্জন দিতেছ, মনে রাখিও, তাহা সময়ের এক নিষ্ঠুর পরিহাস মাত্র। এই রূপের অহংকারে মত্ত হইয়া নিজের চরিত্র কলুষিত করিও না। কারণ, চরিত্রের সুবাসই মানুষকে মরণোত্তর জীবনে অমর করিয়া রাখে,
যৌবনের উন্মাদনায় প্রবৃত্তি তোমাকে বারবার বিপথে ডাকিবে।
মনে হইবে, এই তো সময় উপভোগের! কিন্তু স্মরণ রাখিও, বল্গাহীন অশ্ব যেমন আরোহীকে ধ্বংসের গহ্বরে নিক্ষেপ করে, অসংযমী যৌবনও তেমনি মানুষের ইহকাল ও পরকাল ছারখার করিয়া দেয়।
যে বীর রণক্ষেত্রে শত্রু দমন করে সে-ই প্রকৃত বীর নহে; বরং সে-ই শ্রেষ্ঠ বীর যে নিজের কু-প্রবৃত্তিকে দমন করিতে সক্ষম। দৃষ্টির সংযম ও হৃদয়ের পবিত্রতাই হউক তোমার ভূষণ।
যৌবনকাল হইল শস্য বপনের উপযুক্ত ঋতু। এই সময়ে যদি তুমি অলসতা ও আমোদ-প্রমোদে মগ্ন থাকিয়া কণ্টক বৃক্ষ রোপণ করো, তবে বার্ধক্যে তোমাকে বিষফলই ভক্ষণ করিতে হইবে। জ্ঞান অন্বেষণে এবং স্রষ্টার আরাধনায় এই শক্তিকে ব্যয় করো। কালচক্রের আবর্তে যখন তোমার চর্ম কুঞ্চিত হইবে এবং অস্থি শিথিল হইবে, তখন যেন পশ্চাৎপানে চাহিয়া তোমাকে অশ্রুপাত করিতে না হয়।
ওহে অর্বাচীন! মরীচিকার পশ্চাতে ধাবিত হইয়া নিজের অমূল্য জীবনকে মরুভূমি করিও না। যে যৌবন স্রষ্টার প্রেমে ও আর্তমানবতার সেবায় উৎসর্গিত হয়, তাহাই সার্থক। মনে রাখিও, যৌবনের এই তরী যদি সঠিক পথে চালিত না হয়, তবে জীবনের মহাসমুদ্রে কূল পাওয়া ভার হইবে।
ওহে নবীন অভিযাত্রী! শ্রবণ করো এই নিভৃত বাণী। তোমার এই কালচক্রের মাহেন্দ্রক্ষণ—যৌবন, ইহা তো কেবল ভোগের নিমিত্তে নহে, ইহা ত্যাগের ও অর্জনের মহোৎসব।
জ্ঞানের সাগর অতলস্পর্শী, তুমি কি তাহার সন্ধান লইয়াছ?
যৌবন যখন তুঙ্গে তব, আলস্যে কেন কাল যাপিয়াছ?
পুঁথিগত ঐ বিদ্যা কেবল পরীক্ষার তরে নহে জানিও,
বিবেকের দ্বারে জ্ঞানের প্রদীপ অতি সযতনে জ্বালিও।
যাহার মস্তকে জ্ঞানের মুকুট, বার্ধক্য তাহারে দমিবে না,
সময়ের স্রোতে ডুবিলেও কভু, তাহার তরী তো ডুবিবে না।
কাক কভু কোকিলের কুহুতান শিখিতে পারে না ভাই,
তেমনি অসৎ সঙ্গে কভু সুমতির দেখা নাই।
যাহার বাক্যে হিতোপদেশ নাই, কেবলই আছে বিষাদ,
তাহার সঙ্গ ত্যাগিয়া চলো, নতুবা ঘটিবে প্রমাদ।
যৌবন-তরী ডুবাইবে যদি কু-সঙ্গের ঐ ঝড়ে,
পস্তাইবে তখন একা বসিয়া কালান্তরের চরে।
ললাটে তোমার তেজের আভা, বাহুতে তোমার শক্তি,
ইহা কেবলি সার্থক হয় যদি থাকে স্রষ্টাতে ভক্তি।
অসহায় আঁখির অশ্রু মুছিতে যদি না পারো এই কালে,
তবে বৃথাই তোমার আসা এই ধরণীর মায়াজালে।
যৌবনমদে মত্ত হইয়া করিও না কারো অপমান,
মনে রাখিও, ক্ষুদ্র বালুকণা ঘিরিয়াই হয় মরু উদ্যান।
শেষ কথা:
ওহে পুষ্পরেণু! জাগিয়া ওঠো এই প্রাতঃকালে। তোমার চারিত্রিক দৃঢ়তাই হউক তোমার বর্ম। যে যৌবন সংযমে বাঁধানো, তাহাই হীরাখণ্ডের ন্যায় উজ্জ্বল। সময়ের এই ঘোড়াকে বল্গাহীন ছাড়িয়া দিও না, বরং ইহাকে চালিত করো সেই পথে—যেই পথে চলিলে মানবের মুক্তি এবং পরকালের শান্তি নিশ্চিত হয়।
তোফায়েল আহমাদ

0 মন্তব্যসমূহ